লস আলামোসের অভেদ্য দুর্গ ও একজন হ্যাকার
১৯৪০ এর দশকে ম্যানহাটন প্রজেক্টের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকোর লস আলামোস ছিল বিজ্ঞানের নামে গড়ে ওঠা এক অভেদ্য সামরিক দুর্গ। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে জেতার জন্য এখানে চলছিল পারমাণবিক বোমা তৈরির বিপুল কর্মযজ্ঞ।
চারপাশে কঠোর পাহারা, সিল করা দরজা, তালাবদ্ধ আয়রন সেফ। সবকিছু মিলিয়ে সামরিক কর্তারা দৃঢ় বিশ্বাসে বলতেন, পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা এটিই। কিন্তু তরুণ গবেষক রিচার্ড ফাইনম্যান নিরাপত্তাকে কখনোই তালা-চাবির ব্যাপার হিসেবে দেখেননি। তিনি দেখতেন মানুষের মন, অভ্যাস, অলসতা আর আত্মতুষ্টির ফাঁকফোকর।
সেফ হ্যাকিং ও সতর্কবার্তা
একদিন সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ আর ধার করা একটি স্ক্রু-ড্রাইভার দিয়ে তিনি চুপচাপ একটি সিল করা আয়রন সেফ খুলে ফেললেন। তারপর কোনো নাটক না করে, কোনো উত্তেজনা না দেখিয়ে, ভেতরের গোপন নথিগুলো তুলে দিলেন হতভম্ব পদার্থবিদদের হাতে।
সামরিক কর্মকর্তারা যেখানে “অভেদ্য তালা” নিয়ে গর্ব করতেন, ফাইনম্যান সেখানে খেয়াল করতেন ছোট ছোট আঁচড়, বারবার ব্যবহৃত কম্বিনেশন নম্বর, আর মানুষের চিরাচরিত সেই দুর্বলতা—জন্মদিন, সহজ সংখ্যা বা পরিচিত প্যাটার্ন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি একের পর এক ডজনখানেক আয়রন সেফ খুলে ফেললেন। প্রতিবার ভেতরে রেখে আসতেন একটি ভদ্র নোট: “Please improve your security.”
তিনি কিছুই নেননি। তাঁর কাছে এটা নিছক দুষ্টুমি নয়, ছিল এক ধরনের সতর্কবার্তা। বিজ্ঞান আনুষ্ঠানিকতার ওপর দাঁড়ায় না; দাঁড়ায় সততার ওপর, নিজের দুর্বলতা স্বীকার করার সাহসে।
ব্যক্তিগত শোক ও বিজ্ঞানের দর্শন
তবে তাঁর এইসব কার্যকলাপের আড়ালে ছিল গভীর এক ব্যক্তিগত শোক। লস আলামোসে আসার আগেই ফাইনম্যান হারিয়েছেন তাঁর প্রথম স্ত্রী আর্লিনকে। তবু প্রতিদিন তাঁকে চিঠি লিখতেন, মৃত্যুর পরেও। সেই চিঠিগুলো তিনি লুকিয়ে রাখতেন নিজের ডরমিটরির একটি ছোট বাক্সে।
রাতে মন স্থির রাখতে বাজাতেন বংগো ড্রাম। ক্যান্টিনে বসে ন্যাপকিনে আঁকতেন সমীকরণ। আর সিনিয়র বিজ্ঞানীদের সামনে এমন প্রশ্ন করতেন, যেটা প্রচলিত তত্ত্বের দেয়ালে ফাটল ধরিয়ে দিত। কেন এটা সত্য বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে? আমরা কি সত্যিই পরীক্ষা করে দেখেছি, নাকি শুধু অভ্যাসের বশে বিশ্বাস করছি? এইসব প্রশ্ন তিনি অবলীলায় ছুঁড়ে দিতেন সিনিয়র বিজ্ঞানীদের মুখের উপর।
শিক্ষকতা ও জ্ঞানের জাদুকর
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ হলে সেই একই মানসিকতা নিয়ে তিনি ঢুকে পড়েন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায়। কর্নেলে তাঁর ক্লাস ছিল যেন জীবন্ত বিদ্যুৎ। ব্ল্যাকবোর্ডে তাঁর চকের গতি ছিল ছাত্রদের চিন্তার চেয়েও দ্রুত।
এরপর ক্যালটেকে গিয়ে তিনি যেখানেই জায়গা পেতেন সেখানেই লিখতেন। ব্ল্যাকবোর্ড, জানালার ফ্রেম, প্লেট, এমনকি রেস্টুরেন্টের মেনু, কিছুই বাদ যেত না। কোয়ান্টাম ইলেকট্রো-ডাইনামিক্সের মতো কঠিন বিষয় তিনি এমনভাবে বোঝাতেন, যেন জটিলতাই লজ্জা পেয়ে সরে যায়। তাঁর কাছে জ্ঞান কোনো অলংকার ছিল না; ছিল ভাগ করে নেওয়ার জিনিস।
চ্যালেঞ্জার দুর্ঘটনা ও তদন্ত কমিশন
“নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস নয়”—তাঁর এই নীতিই পরে চ্যালেঞ্জার দুর্ঘটনার তদন্তে ফাইনম্যানকে আলাদা করে চিহ্নিত করে। ১৯৮৬ সালে স্পেস শাটল চ্যালেঞ্জার বিস্ফোরণের পর তিনি রজার্স কমিশনের সদস্য হিসেবে তদন্তে যুক্ত হন।
কিন্তু কমিশনের কাজের ধরন তাঁকে দ্রুত অস্বস্তিতে ফেলেছিল। দিনের পর দিন নাসার কর্মকর্তারা জটিল প্রযুক্তিগত ভাষায় কথা বলছিলেন, দায় এড়িয়ে যাচ্ছিলেন, আর ঘটনাটিকে একটি “দুর্ভাগ্যজনক দুর্ঘটনা” হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা চলছিল। ফাইনম্যান এইসব কথার ঘোরটোপে সন্তুষ্ট হননি। তাঁর প্রশ্ন ছিল খুব সাধারণ, “যন্ত্রটা কি ঠান্ডায় ঠিকভাবে কাজ করে?”
তিনি আনুষ্ঠানিক বৈঠকের বাইরে গিয়ে সরাসরি প্রকৌশলীদের সঙ্গে কথা বলেন। কাগজে-কলমে নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে। তখনই তিনি জানতে পারেন, রকেটের জয়েন্টে ব্যবহৃত রাবারের “ও-রিং” ঠান্ডা তাপমাত্রায় শক্ত হয়ে যায়। এই আশঙ্কা আগেও তোলা হয়েছিল, কিন্তু ব্যবস্থাপনার স্তরে সেটিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ফাইনম্যান বুঝলেন, সমস্যাটা শুধু প্রযুক্তির ব্যর্থতা নয়; সমস্যাটা ছিল ব্যবস্থাপনার আত্মপ্রবঞ্চনা।
সেই ঐতিহাসিক পরীক্ষা: বরফজলে ও-রিং
তারপর এল সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। কোনো বক্তৃতা নয়, কোনো জটিল গ্রাফ নয়। সরাসরি টেলিভিশনের ক্যামেরার সামনে তিনি এক টুকরো রাবারের “ও-রিং” বরফঠান্ডা পানিতে ডুবিয়ে দিলেন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সেটি শক্ত হয়ে গেল, নমনীয়তা হারাল।
ঘরে নেমে এলো নিস্তব্ধতা। ফাইনম্যান শান্ত গলায় বললেন, “এই কারণেই চ্যালেঞ্জার ভেঙে পড়েছে।” এখানে কোন রাজনীতি নেই, অলংকার নেই, শুধু চোখের সামনে রাখা সত্য।
তদন্ত রিপোর্ট লেখার সময়ও তিনি আপস করেননি। কমিশনের মূল প্রতিবেদনে যেখানে ভাষা ছিল নরম, ফাইনম্যান সেখানে নিজের একটি আলাদা সংযোজন যোগ করেন। সেখানে তিনি স্পষ্ট করে লেখেন, বাস্তবতা আর ব্যবস্থাপনার মধ্যে গভীর ফাঁক ছিল। আর লিখে যান সেই ঐতিহাসিক বাক্যটি:
“প্রকৃতির সঙ্গে প্রতারণা করা যায় না।” (Nature cannot be fooled.)
উপসংহার
নোবেল পুরস্কার পেলেও ফাইনম্যান কখনো খ্যাতির পেছনে ছোটেননি। তিনি বেশি স্বচ্ছন্দ ছিলেন আন্ডার গ্রাজুয়েট ছাত্রদের আড্ডায় এবং সাধারণ মানুষের প্রশ্নে।
রিচার্ড ফাইনম্যান একটি কঠিন কিন্তু নির্মমভাবে সৎ নীতিতে বেঁচে ছিলেন; যেটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটাকে নিজেই যাচাই করে দেখো। লস আলামোসের আয়রন সেফ খোলা থেকে শুরু করে চ্যালেঞ্জার দুর্ঘটনার নির্মম সত্য উন্মোচন, সব জায়গায় তিনি দেখিয়ে গেছেন—স্পষ্টতা আর সাহস একসাথে হলে ক্ষমতা আর কর্তৃত্বও শেষ পর্যন্ত নীরব হয়ে যায়।
