একজন নিভৃতচারী বিজ্ঞানী
আজ প্রখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী অমল কুমার রায়চৌধুরীর জন্মদিন। ১৯২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর, তিনি অবিভক্ত বাংলার বরিশালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। তাঁর বাবা ছিলেন গণিতের শিক্ষক, বাবার কাছেই তাঁর গণিতে হাতেখড়ি হয়েছিলো।
পরবর্তীতে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে পদার্থবিজ্ঞানে অনার্স এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বিষয়ে মাস্টার্স করেছিলেন। তারপর শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন স্যার আশুতোষ কলেজে।
সাধারণ আপেক্ষিকতা ও যুগান্তকারী আবিষ্কার
এই কলেজে শিক্ষকতা করার সময় তিনি আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা বা জেনারেল রিলেটিভিটি নিয়ে গবেষণার কাজ শুরু করেন। সেই গবেষণারই এক পর্যায়ে তিনি তাঁর বিখ্যাত সমীকরণটি আবিষ্কার করেন। পদার্থবিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলা হয় “রায়চৌধুরী সমীকরণ”।
এই সমীকরণের মাধ্যমে তিনি মহাকর্ষ বলের আকর্ষণধর্মিতার একটি গ্রহণযোগ্য গাণিতিক ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। ১৯৫৫ সালে তিনি সমীকরণটি বিশ্বখ্যাত ‘ফিজিক্যাল রিভিউ’ জার্নালে প্রকাশ করেছিলেন। সমীকরণটি প্রকাশিত হবার পর এটি বিজ্ঞানী মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং এর মাধ্যমেই অমল কুমার রায়চৌধুরী বিশ্বব্যাপী খ্যাতি লাভ করেন।
সহজ ভাষায় রায়চৌধুরী সমীকরণ
রায়চৌধুরী সমীকরণ বোঝার জন্য উচ্চতর গণিতের জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। কিন্তু এর সারমর্ম বোঝা খুব কঠিন নয়। বিষয়টি সহজভাবে উপস্থাপন করছি:
আমরা যে জগতে বাস করি, তার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা এবং সময়—এই চারটি মাত্রা রয়েছে। এগুলো নিয়েই গঠিত হয়েছে মহাবিশ্বের চতুর্মাত্রিক অবকাঠামো, যাকে বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন, স্পেস-টাইম বা স্থান-কাল। ১৯১৫ সালে আইনস্টাইন বলেছিলেন, বস্তুর ভরের প্রভাবে এর চারপাশের স্থান-কাল বেঁকে যায়, আর এই বক্রতাকেই মহাকর্ষ হিসেবে আমরা অনুভব করি। তার মানে, মহাকর্ষ আসলে কোনো আলাদা বল নয়, বরং এটা স্থান-কালের একটি বিশেষ জ্যামিতিক বৈশিষ্ট্য।
কিন্তু এই বৈশিষ্ট্যের প্রকৃত রূপ কি? মহাকর্ষ কেন শুধুমাত্র আকর্ষণধর্মী? সেটার ব্যাখ্যা আমরা পাই রায়চৌধুরী সমীকরণ থেকে।
তিনি গাণিতিকভাবে দেখালেন, কোনো বস্তু যখন বাইরের কোনো বলের প্রভাব ছাড়া চলে, তখন যে সোজা পথ ধরে চলে, তাকে বলে, ‘জিওডেসিক’। কিন্তু চলার পথে ভারী কোনো বস্তু থাকলে তার জিওডেসিকগুলো ওই ভারী বস্তুর দিকে বেঁকে যায়। আর এই জিওডেসিকের বেঁকে যাওয়াটাই তৈরি করে মহাকর্ষের আকর্ষণধর্মী বলের অনুভূতি।
বিগ ব্যাং ও সিঙ্গুলারিটি রহস্য
এই সমীকরণ দিয়ে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বোঝা যায়। আমরা জানি, মহাবিশ্বের শুরু হয়েছিল বিগ ব্যাং নামের এক মহাবিস্ফোরণ থেকে। যদি সময়ের বিপরীতে পিছিয়ে যেতে থাকি, তাহলে এক সময় আমরা এমন এক অবস্থায় পৌঁছাব, যেখান থেকে আর পেছনে ফেরা যাবে না। তার মানে, মহাবিশ্বের যাত্রা আসলে শুরু হয়েছিল একটি নির্দিষ্ট সময় থেকে। এর আগে কী ছিল, সেটা জানা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
যখনই মহাবিশ্বে এমন একটি সীমা চলে আসে যেটাকে অতিক্রম করা যায় না, তখন আমরা তাকে বলি “সিঙ্গুলারিটি“। এখন প্রশ্ন হলো, সিঙ্গুলারিটিকে কি এড়ানো সম্ভব? আইনস্টাইনের তত্ত্ব কি এমন কোনো বিকল্প মহাবিশ্বের ধারণা দিতে পারে, যেখানে কোনো সিঙ্গুলারিটি নেই?
কসমোলজি বা মহাবিশ্ব তত্ত্বের মৌলিক এই প্রশ্নের উত্তর প্রথম পাওয়া যায় রায়চৌধুরী সমীকরণ থেকে। তিনি দেখিয়েছিলেন, যদি আমরা সময়ের বিপরীতে পিছিয়ে যেতে থাকি, তাহলে সবকিছু একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে গিয়ে মিলে যায়। এটাই প্রমাণ করে, মহাবিশ্বের সূচনায় বিগ ব্যাং আসলে এড়ানো সম্ভব নয়।
হকিং, পেনরোজ ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
পরবর্তীতে ১৯৬০-৭০ এর দশকে স্টিফেন হকিং ও রজার পেনরোজ রায়চৌধুরী সমীকরণের ভিত্তিতে গাণিতিকভাবে দেখিয়ে দেন, মহাবিশ্বের জন্ম সিঙ্গুলারিটি থেকেই হয়েছে, এটা এড়ানোর কোনো উপায় নেই। এভাবেই রায়চৌধুরী সমীকরণ চেনা মহাবিশ্বের গভীরতম সত্য উন্মোচন করতে সাহায্য করেছে।
অধ্যাপক রায়চৌধুরী ছিলেন বিরল এক প্রতিভার অধিকারী। শিক্ষক হিসেবেও তিনি ছিলেন অতুলনীয়। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে অনেকেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খ্যাতি লাভ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে (১৯৭৯) তিনি অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে “থিওরেটিক্যাল কসমোলজি” নামে একটি টেক্সট বুক প্রকাশ করেছিলেন। এই বইটি কসমোলজিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
২০০৫ সালের ২৫ জুলাই ৮১ বছর বয়সে ক্ষণজন্মা এই বিজ্ঞানী পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গেছেন। কিন্তু বিশ্ব বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তিনি রেখে গেছেন তাঁর অনন্য অবদান। আজ তাঁর জন্মদিনে সশ্রদ্ধ চিত্তে তাঁকে স্মরণ করছি।
