Saturday, February 28, 2026

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ওয়েব সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।  আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকোয়ান্টাম কম্পিউটার: আগামীর প্রযুক্তি বিপ্লব ও সম্ভাবনা

কোয়ান্টাম কম্পিউটার: আগামীর প্রযুক্তি বিপ্লব ও সম্ভাবনা

কোয়ান্টাম কম্পিউটার-কে অনেকেই “ভবিষ্যতের কম্পিউটার” বলে মনে করেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেই ভবিষ্যৎ আর বেশি দূরে নয়; এখনই আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে। এক সময় যেমন বিদ্যুৎ, টেলিফোন বা ইন্টারনেট মানুষের জীবনযাত্রাকে আমূল পাল্টে দিয়েছিল, ঠিক তেমনিভাবেই কোয়ান্টাম কম্পিউটারও প্রযুক্তি-বিশ্বে এক নতুন বিপ্লবের সূচনা করতে চলেছে।

বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যেই এর প্রথম কার্যকরী সংস্করণ বানিয়ে ফেলেছে এবং প্রতিদিন সেটিকে আরও শক্তিশালী করার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। আমাদের চারপাশে অদৃশ্য এক নীরব দৌড় চলছে—কে আগে সেই কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি করবে, যেটা মুহূর্তের মধ্যে এমন সব হিসেব করে ফেলবে, যা করতে বর্তমানের সুপার কম্পিউটারের হাজার বছর সময় লাগে।

কীভাবে কাজ করে কোয়ান্টাম কম্পিউটার?

সাধারণ কম্পিউটারের প্রসেসর ‘বিট’ (Bit) ব্যবহার করে কাজ করে। বিট হয় শূন্য (০) অথবা এক (১)—যেমন সুইচ হয় অন, না হয় অফ। কিন্তু কোয়ান্টাম কম্পিউটারে সেই বিটের জায়গা নেয় ‘কিউবিট’ (Qubit)। কিউবিটের বিশেষত্ব হলো, এটি একসাথে ০ এবং ১ দুটো অবস্থায়ই থাকতে পারে। এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যকে বলা হয় ‘সুপারপজিশন’ (Superposition)।

এর সাথে আছে আরেকটি বিস্ময়কর ক্ষমতা, যার নাম ‘এনট্যাঙ্গলমেন্ট’ (Entanglement)। দুটি কিউবিট একবার এনট্যাঙ্গেলড বা সংযুক্ত হলে, একটির পরিবর্তন সঙ্গে সঙ্গে অন্যটিতে প্রভাব ফেলে, তারা যত দূরেই থাকুক না কেন। এই দুই বৈশিষ্ট্য মিলিয়ে কোয়ান্টাম কম্পিউটার একই সঙ্গে অসংখ্য সম্ভাবনার হিসেব করতে পারে, যেটা সাধারণ কম্পিউটারকে করতে হয় ধাপে ধাপে।

বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা ও অগ্রগতি

এই প্রযুক্তির দৌড়ে এখন বিশ্বের সেরা কিছু প্রতিষ্ঠান ও দেশ নেমে পড়েছে। তাদের অগ্রগতিও চোখে পড়ার মতো:

  • আইবিএম (IBM): ২০১৯ সালে তারা চালু করে “আইবিএম কোয়ান্টাম সিস্টেম ওয়ান”। এরপর ২০২২ সালে ৪৩৩ কিউবিটের “অসপ্রে” এবং ২০২৩ সালে ১,১২১ কিউবিটের “কনডর” প্রসেসর তৈরি করে। বর্তমানে তারা “স্টারলিং” নামে একটি ফল্ট-টলারেন্ট সিস্টেম তৈরিতে কাজ করছে।
  • গুগল (Google): ২০১৯ সালে গুগল ঘোষণা করে তাদের ৫৩ কিউবিটের “সাইকামোর” প্রসেসরের কথা। এটি মাত্র ২০০ সেকেন্ডে এমন একটি জটিল হিসেব সম্পন্ন করেছে, যা সুপারকম্পিউটারের করতে প্রায় দশ হাজার বছর লাগত। একে তারা নাম দিয়েছে ‘কোয়ান্টাম সুপ্রিমেসি’।
  • মাইক্রোসফট (Microsoft): তারা কাজ করছে ‘টপোলজিকাল কিউবিট’ নিয়ে, যা আরও স্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। তাদের লক্ষ্য আগামী এক দশকের মধ্যে এটি বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আনা।
  • অন্যান্য: কানাডার ডি-ওয়েভ, চীনের জিউঝাং প্রসেসর এবং জাপানের ফুজিৎসু ও টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ও এই খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে।

কোয়ান্টাম কম্পিউটারের বৈপ্লবিক ব্যবহার

কোয়ান্টাম কম্পিউটারের ক্ষমতা কেবল দ্রুত গতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর ব্যবহারিক ক্ষেত্রও বিশাল:

১. চিকিৎসাবিজ্ঞান: নতুন ওষুধ তৈরি করতে বিজ্ঞানীদের বিশাল পরিমাণ ডেটা এনালাইসিস করতে হয়। কোয়ান্টাম কম্পিউটার জটিল প্রোটিন ফোল্ডিং প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করে ক্যান্সার, আলঝেইমার্স এবং কোভিড-১৯-এর মতো রোগের চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।

২. অর্থনীতি ও ব্যাংকিং: মরগ্যান স্ট্যানলি এবং জেপি মরগ্যানের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও ট্রেডিং অ্যালগরিদম তৈরিতে এটি ব্যবহারের চেষ্টা করছে। এটি মুহূর্তের মধ্যে স্টক মার্কেটের বিশাল ডেটা বিশ্লেষণ করতে সক্ষম।

৩. সাইবার সিকিউরিটি: প্রচলিত এনক্রিপশন ভাঙা সাধারণ কম্পিউটারের পক্ষে কঠিন হলেও, শোর’স অ্যালগরিদম ব্যবহার করে কোয়ান্টাম কম্পিউটার তা দ্রুত ভেঙে ফেলতে পারে। এর ফলে ভবিষ্যতে হ্যাকিং প্রতিরোধে ‘কোয়ান্টাম-প্রুফ’ এনক্রিপশন তৈরি হবে, যা ইন্টারনেটকে করবে সবচেয়ে নিরাপদ।

৪. জলবায়ু ও এআই: জলবায়ুর নিখুঁত পূর্বাভাস এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) দক্ষতা বাড়াতে—যেমন ফেসিয়াল রিকগনিশন বা ভাষা অনুবাদে—এই কম্পিউটার বিপ্লব ঘটাতে পারে।

বর্তমান অবস্থা ও চ্যালেঞ্জ

এখানে বলে রাখি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং প্রযুক্তি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এর বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কিউবিট অত্যন্ত সংবেদনশীল; সামান্য তাপমাত্রা পরিবর্তনের কারণে এর স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে, যা ‘ডিকোহেরেন্স’ নামে পরিচিত। এজন্য কোয়ান্টাম কম্পিউটারকে প্রায় শূন্য কেলভিন তাপমাত্রায় রাখতে হয়, যা খুবই ব্যয়বহুল।

এছাড়া কিউবিট বাড়ার সাথে সাথে ‘এরর কারেকশন’ বা ত্রুটি সংশোধনের জটিলতাও বাড়ে। প্রচলিত কম্পিউটারের প্রোগ্রামিং ভাষাও এখানে অচল, তাই প্রয়োজন নতুন সফটওয়্যার ইকোসিস্টেম। এসব কারণেই সাধারণ মানুষের হাতে এই প্রযুক্তি পৌঁছাতে এখনো অনেকটা পথ বাকি।

উপসংহার

তবুও বিজ্ঞানীরা আশাবাদী। যেদিন পূর্ণাঙ্গ ও স্থিতিশীল কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি হবে, সেদিন ওষুধ আবিষ্কার থেকে মহাকাশ গবেষণা—সব ক্ষেত্রেই শুরু হবে এক নতুন যুগ। সময়টা হয়তো এক দশক পর, কিংবা আরও বেশি। কিন্তু এই পথের শেষপ্রান্তে অপেক্ষা করছে কম্পিউটিংয়ের এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এটি কেবল দ্রুত কম্পিউটিং নয়, বরং মানব সভ্যতার চিন্তাধারা পাল্টে দেওয়ার মতো একটি অনন্য আবিষ্কার হতে যাচ্ছে।

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular