মহাবিশ্বের শেষ কোথায়?
মহাবিশ্বের শুরু নিয়ে আমরা অনেক কথা বলি। বিগ ব্যাং, প্রসারণ, স্থান ও সময়ের জন্ম – এসব এখন পরিচিত আলোচনা। কিন্তু খুব কম মানুষ আছেন, যারা শুরু নয়, শেষ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। মহাবিশ্ব কি অনন্তকাল ধরে প্রসারিত হবে? নাকি একদিন সব আলো নিভে যাবে? নাকি আবার সংকুচিত হয়ে ফিরে যাবে এক আদিম ঘন অবস্থায়? এই চূড়ান্ত প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে বসেছিলেন একজন বাঙালি গণিতবিদ, যার নাম, জামাল নজরুল ইসলাম। বিজ্ঞানী মহলে যিনি প্রফেসর জে. এন. ইসলাম নামেই বেশি পরিচিত।
জন্ম, শিক্ষা ও কেমব্রিজ জীবন
১৯৩৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি, অবিভক্ত বাংলার ঝিনাইদহে তাঁর জন্ম। ছোটবেলা থেকেই অঙ্কের প্রতি তাঁর ছিল গভীর আকর্ষণ। সমস্যাকে তিনি কেবল সমাধান করতেন না, তার ভেতরের গঠনও বিশ্লেষণ করতেন। কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে গণিতে অনার্সসহ স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজে উচ্চশিক্ষার জন্য যান।
ফলিত গণিত ও তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে গবেষণা করে তিনি ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে কেমব্রিজের ইনস্টিটিউট অব থিওরিটিক্যাল অ্যাস্ট্রোনমিতে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হন। তাঁর গবেষণার ক্ষেত্র ছিল কসমোলজি। মহাবিশ্বের উৎপত্তি, গঠন, বিবর্তন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান।
কসমোলজির বিকাশ ও মহাবিশ্বের উৎপত্তি
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে কসমোলজি ছিল দ্রুত বিকাশমান একটি শাখা। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা মহাবিশ্বকে বোঝার জন্য এক নতুন জ্যামিতিক কাঠামো দেয়। ১৯৬৫ সালে কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড বিকিরণের আবিষ্কার বিগ ব্যাং তত্ত্বকে শক্ত ভিত্তি দেয়। বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন প্রায় ১৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন বছর আগে স্থান ও সময়ের সূচনা হয়েছিল।
বিগ ব্যাং কোনো ফাঁকা জায়গায় বিস্ফোরণ ছিল না; বরং স্থান নিজেই প্রসারিত হতে শুরু করে। প্রথম কয়েক মিনিটে নিউক্লিওসিন্থেসিস প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের নিউক্লিয়াস। এর বহু পরে ইলেকট্রনের সাথে যুক্ত হয়ে গঠিত হয় নিরপেক্ষ পরমাণু, তারপর নক্ষত্র, গ্যালাক্সি এবং বৃহৎ মহাজাগতিক কাঠামো।
পরিণতি: উন্মুক্ত, সমতল না আবদ্ধ?
কিন্তু উৎপত্তির প্রশ্নের পরই এসে দাঁড়ায় আরেকটি গভীর প্রশ্ন, মহাবিশ্বের এই প্রসারণ কি অনন্তকাল চলবে? নাকি একদিন মহাকর্ষ জয়ী হয়ে সবকিছু সংকুচিত করবে? মহাবিশ্বের জ্যামিতি কি খোলা, সমতল, না বন্ধ? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নির্ভর করে মহাবিশ্বের সামগ্রিক ঘনত্বের উপর। এই জটিল প্রশ্নকে গাণিতিক কাঠামোর মধ্যে বিশ্লেষণ করার কাজেই নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন প্রফেসর জে. এন. ইসলাম।
দি আল্টিমেট ফেইট অব দি ইউনিভার্স
১৯৭৭ সালে তিনি মহাবিশ্বের সম্ভাব্য অন্তিম পরিণতি নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। এরপর ১৯৮৩ সালে কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর বই “দি আল্টিমেট ফেইট অব দি ইউনিভার্স”। বইটি আন্তর্জাতিক পরিসরে ব্যাপক সাড়া ফেলে। বইটিতে তিনি সাধারণ আপেক্ষিকতার সমীকরণ ব্যবহার করে বিভিন্ন কসমোলজিক্যাল মডেলের দীর্ঘমেয়াদি আচরণ বিশ্লেষণ করেন। তিনি দেখান যে, মহাবিশ্বের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তার ঘনত্ব, জ্যামিতি এবং প্রসারণের গতির উপর।
তাঁর আলোচনায় উঠে আসে কয়েকটি সম্ভাব্য পরিণতি। যদি ঘনত্ব ক্রিটিক্যাল ডেনসিটির চেয়ে বেশি হয়, তবে প্রসারণ থেমে সংকোচন শুরু হতে পারে, যেটা একসময় “বিগ ক্রাঞ্চ”-এ গিয়ে শেষ হবে। যদি ঘনত্ব কম হয় এবং প্রসারণ অব্যাহত থাকে, তবে নক্ষত্রগুলো ধীরে ধীরে নিভে যাবে, শক্তি সমভাবে ছড়িয়ে পড়বে, এবং মহাবিশ্ব প্রবেশ করবে “বিগ ফ্রিজ” বা “হিট ডেথ”-এর দিকে।
পরবর্তী সময়ে ডার্ক এনার্জির আবিষ্কার দেখায় যে, মহাবিশ্বের প্রসারণ ত্বরান্বিত হচ্ছে, ফলে বিগ ফ্রিজ মডেলই বর্তমানে বেশি গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত। তবে প্রফেসর জে এন ইসলামের কাজের গুরুত্ব এখানেই, তিনি ডার্ক এনার্জির আবিষ্কারের আগেই সম্ভাব্য ভবিষ্যৎগুলোর একটি সুসংহত গাণিতিক বিশ্লেষণ নির্মাণ করেছিলেন।
গাণিতিক কসমোলজি ও আপেক্ষিকতা
তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ, “অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু ম্যাথমেটিক্যাল কসমোলজি” গাণিতিক কসমোলজির ক্ষেত্রে একটি মৌলিক পাঠ্য হিসেবে বিবেচিত। সেখানে তিনি কসমোলজিকে জনপ্রিয় ব্যাখ্যার স্তর থেকে তুলে এনে কঠোর গণিতের ভাষায় উপস্থাপন করেন। এছাড়া “রোটেটিং ফিল্ডস ইন জেনারেল রিলেটিভিটি” গ্রন্থে তিনি সাধারণ আপেক্ষিকতার কাঠামোর মধ্যে ঘূর্ণায়মান ক্ষেত্র ও মহাবিশ্বের মডেল বিশ্লেষণ করেন। তাঁর কাজ মূলত আপেক্ষিকতাভিত্তিক কসমোলজি, ঘূর্ণায়মান মহাবিশ্বের মডেল এবং মহাকর্ষীয় সংকোচন নিয়ে বিস্তৃত।
দেশে প্রত্যাবর্তন ও নিজস্ব গবেষণাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা
১৯৮৪ সালে তিনি বিদেশের প্রতিষ্ঠিত একাডেমিক জীবন ত্যাগ করে বাংলাদেশে ফিরে আসেন এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে যোগ দেন। সেখানে তিনি “রিসার্চ সেন্টার ফর ম্যাথমেটিক্যাল অ্যান্ড ফিজিক্যাল সায়েন্সেস” প্রতিষ্ঠা করেন। এই সিদ্ধান্ত ছিল এক ধরনের নীরব বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান। তিনি বিশ্বাস করতেন, জ্ঞান কেবল আমদানি নয়; বরং নিজস্ব মাটিতে উৎপাদন করতে হয়। তাঁর তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশের বহু শিক্ষার্থী উচ্চতর গবেষণায় যুক্ত হন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে প্রফেসর ইমেরিটাসের মর্যাদা দেয়।
মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চা ও কৃষ্ণবিবর
বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন অগ্রগণ্য। তাঁর লেখা “কৃষ্ণবিবর” বইটি ব্ল্যাকহোল বিষয়ক বাংলা ভাষায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। “মাতৃভাষা ও বিজ্ঞান চর্চা” গ্রন্থে তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে, নিজের ভাষায় বিজ্ঞানচর্চা না হলে জ্ঞানের সঙ্গে আত্মপরিচয়ের সংযোগ তৈরি হয় না। ভাষা কেবল প্রকাশের মাধ্যম নয়; চিন্তার কাঠামোও নির্ধারণ করে।
মহাকালের বুকে স্থায়ী পদচিহ্ন
২০১৩ সালের ১৬ মার্চ তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করে। ২০০১ সালে তিনি একুশে পদক পেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর প্রকৃত উত্তরাধিকার পুরস্কারে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি দেখিয়েছেন, মহাবিশ্বের শেষ নিয়ে প্রশ্ন তোলা মানে কেবল বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান নয়, এটি এক ধরনের দার্শনিক জিজ্ঞাসা। কঠোর গণিতের কাঠামোর ভেতর দিয়ে অস্তিত্বের সীমা নির্ণয় করার এই প্রচেষ্টা তাঁকে অনন্য করে তুলেছে।
মহাবিশ্বের শেষ কোথায়? এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর আমরা এখনো জানি না। কিন্তু সেই প্রশ্নকে গাণিতিক শৃঙ্খলার ভেতর দাঁড় করানোর যে প্রচেষ্টা তিনি করেছিলেন, সেটিই তাঁকে বিজ্ঞানের ইতিহাসে স্থায়ী আসন দিয়েছে। তাঁর চিন্তার আলো হয়তো মহাবিশ্বের চূড়ান্ত পরিণতি নিয়ে, কিন্তু তার দীপ্তি এখনো নিভে যায়নি।
আজ ২৪ ফেব্রুয়ারি, জন্মদিনে তাঁর প্রতি জানাই প্রগাঢ় শ্রদ্ধা।
