১. চিকিৎসা বিজ্ঞান: ইমিউন সিস্টেমের রক্ষাকবচ
ফিজিওলজি অথবা মেডিসিনে এবছর নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তিনজন বিজ্ঞানী। এরা হলেন:
- আমেরিকার মেরি ব্রাঙ্কো
- ফ্রেড রামসডেল
- জাপানের শিমন সাগাগুচি
তাঁরা নোবেল পুরস্কার পেলেন মানবদেহের এক সূক্ষ্ম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার রহস্য উন্মোচনের জন্য। এর নাম, “পেরিফেরাল ইমিউন টলারেন্স”।
আমাদের ইমিউন সিস্টেম জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করে শরীরকে সুস্থ রাখে। কিন্তু একই সঙ্গে তাকে শিখতে হয় নিজের শরীরের কোষকে আক্রমণ না করতে। এই ভারসাম্য নষ্ট হলেই দেখা দেয় বিভিন্ন অটোইমিউন রোগ যেমন, টাইপ-১ ডায়াবেটিস বা রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস।
এই ভারসাম্য বজায় রাখে এক বিশেষ ধরনের কোষ, রেগুলেটরি টি সেল (Treg)। এই কোষের কাজ হলো ইমিউন সিস্টেমকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, যেন নিজের শরীরকে শত্রু ভেবে আক্রমণ না করে।
জাপানি বিজ্ঞানী শিমন সাগাগুচি প্রথম এই কোষের অস্তিত্ব আবিষ্কার করেন। পরে মেরি ব্রাঙ্কো ও ফ্রেড রামসডেল আবিষ্কার করেন Foxp3 নামে এক জিন, যা এই রেগুলেটরিটি সেলকে পরিচালনা করে। দেখা যায়, এই জিনে ত্রুটি হলে শরীর নিজেকেই আক্রমণ করতে শুরু করে, ফলে দেখা দেয় মারাত্মক অটোইমিউন রোগ।
তাঁদের গবেষণায় স্পষ্ট হয়েছে, আমাদের ইমিউন সিস্টেমে দুটি স্তরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা কাজ করে: ১. সেন্ট্রাল টলারেন্স: এটি থাইমাস এবং বোনম্যারোতে তৈরি হওয়া নতুন ইমিউন কোষগুলোকে পরীক্ষা করে ভুল কোষগুলোকে সরিয়ে দেয়। ২. পেরিফেরাল টলারেন্স: এটি সারা শরীরজুড়ে বাকি ইমিউন কোষগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখে।
এই আবিষ্কার শুধু অটোইমিউন রোগ নয়, সেই সাথে ক্যানসার চিকিৎসা, অঙ্গ প্রতিস্থাপন এবং জিন থেরাপির নতুন সম্ভাবনার দ্বারও খুলে দিয়েছে। মানবদেহের ভিতরের এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য বোঝা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়।
২. পদার্থবিজ্ঞান: ম্যাক্রোস্কোপিক কোয়ান্টাম টানেলিং
এই বছর পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তিনজন মার্কিন বিজ্ঞানী। এরা হচ্ছেন:
- জন ক্লার্ক
- মিশেল ডেভোরে
- জন মার্টিনিস
তাঁরা দেখিয়েছেন, কোয়ান্টামের রহস্যময় নিয়ম শুধু ক্ষুদ্র কণায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং বড় সিস্টেমেও কাজ করে।
আমরা জানি, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কোয়ান্টাম জগতের নিয়ম কানুন গুলো বড়ই অদ্ভুত। এই জগতে কোন বস্তুকণাকে যদি শক্ত দেয়ালের দিকে বারবার ছুঁড়ে দেয়া হয়, তাহলে প্রতিবারই সেটা কিন্তু ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসবে না। মাঝে মাঝে সেটার দেয়াল ভেদ করে অন্যদিকে চলে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে। একে বলে, কোয়ান্টাম টানেলিং।
এই ঘটনা এতদিন আমরা শুধু ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণার মধ্যে দেখেছি। বস্তুকণা যত ছোট হবে তার কোয়ান্টাম টানেলিংয়ের সম্ভাবনা তত বেশি হবে। ইলেকট্রনের ক্ষেত্রে কোয়ান্টাম টানেলিং প্রায় নিয়মিত ঘটেই থাকে।
কিন্তু এবারের নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানীরা দেখালেন, এমন টানেলিং বড় বৈদ্যুতিক সার্কিটেও ঘটতে পারে। তাঁরা বানালেন এক বিশেষ ধরনের সুপারকন্ডাক্টর সার্কিট, যেখানে লক্ষ লক্ষ কণা একসাথে এমনভাবে কাজ করে যেন পুরো সার্কিটটাই হয়ে উঠে এক বিশাল কোয়ান্টাম সিস্টেম।
এই সার্কিট কখনো স্থির অবস্থায় থাকে, আবার হঠাৎ করেই কোয়ান্টামের নিয়ম মেনে বাধা পার হয়ে নতুন অবস্থায় চলে যায়। এই ঘটনাকেই বলা হয়, “ম্যাক্রোস্কোপিক কোয়ান্টাম টানেলিং”। অর্থাৎ, বড় কিছুর মধ্যেও ঘটছে সেই সূক্ষ্ম কোয়ান্টামের খেলা!
আরও বিস্ময়ের বিষয় হলো, এই সার্কিটে শক্তি কখনো ধীরে ধীরে বাড়ে না, বরং এক ধাপ থেকে আরেক ধাপে লাফ দিয়ে বাড়ে। একে বলে শক্তির কোয়ান্টাইজেশন। এটা প্রমাণ করে, প্রকৃতির মৌলিক নিয়মগুলো আসলে ধাপে ধাপে চলে, একটানা নয়।
এই আবিষ্কার শুধু তাত্ত্বিক নয়, এর ব্যবহারও বিশাল। এই ধরনের সার্কিট দিয়েই আজ তৈরি হচ্ছে কোয়ান্টাম কম্পিউটার; ভবিষ্যতের সেই যন্ত্র, যেটা একসাথে অসংখ্য জটিল হিসাব করতে পারবে, যেটা কোনো সাধারণ কম্পিউটার পারে না। এই গবেষণার মধ্য দিয়ে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীরা দেখালেন, বৃহত্তর জগতও আসলে ছোট ছোট কোয়ান্টাম কণার মত সম্ভাবনায় বাঁধা।
৩. রসায়ন: মেটাল অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্ক (MOF)
এ বছর রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তিনজন বিজ্ঞানী। এরা হলেন:
- জাপানের সুসুমু কিতাগাওয়া
- অস্ট্রেলিয়ার রিচার্ড রবসন
- আমেরিকার ওমর ইয়াগি
তাঁরা পুরস্কার পেয়েছেন, মেটাল অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্ক-এর (এম ও এফ) উন্নয়নের জন্য।
এই বিজ্ঞানীরা এমন কিছু আণবিক গঠন তৈরি করেছেন যার ভেতরে অসংখ্য ক্ষুদ্র ফাঁকা স্থান থাকে। সেই ফাঁকা জায়গাগুলোর মধ্য দিয়ে গ্যাস বা তরল পদার্থ সহজে প্রবাহিত হতে পারে। ফলে এই ফ্রেমওয়ার্ক ব্যবহার করে মরুভূমির বাতাস থেকে পানি আহরণ, বাতাসের কার্বন ডাই অক্সাইড ধরে রাখা, বিষাক্ত গ্যাস সংরক্ষণ কিংবা রাসায়নিক বিক্রিয়া ত্বরান্বিত করা সম্ভব।
এই গঠনে ধাতব আয়নগুলো কর্নার স্টোনের মতো কাজ করে। আর লম্বা অর্গানিক অণুগুলো তাদের একে অপরের সাথে যুক্ত করে এক ধরণের ক্রিস্টাল তৈরি করে, যার ভেতরে থাকে ছিদ্রযুক্ত ফাঁকা স্থান। বিজ্ঞানীরা ইচ্ছেমতো এর উপাদান বদলে নির্দিষ্ট কাজের জন্য উপযোগী এম ও এফ তৈরি করতে পারেন।
নোবেল কমিটির চেয়ার হেইনার লিঙ্কে বলেছেন, “মেটাল অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্ক আমাদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। এর মাধ্যমে এমন সব উপাদান তৈরি করা যায় যেগুলো আগে কল্পনাও করা যায়নি।”
এই যুগান্তকারী আবিষ্কার প্রমাণ করেছে, আধুনিক রসায়ন শুধু তত্ত্ব নয়, বরং বাস্তব জীবনের বড় সমস্যা যেমন সূপেয় পানি সংকট, পরিবেশ দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কার্যকর সমাধান দিতে পারে। ২০২৫ সালের নোবেল পুরস্কার বিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ পথকে এক নতুন দিকনির্দেশনা দিল।
