Thursday, January 15, 2026

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ওয়েব সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।  আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeমহাকাশ বিজ্ঞানচন্দ্রকলা ও চন্দ্রগ্রহণ: চাঁদের রূপ বদলানোর বৈজ্ঞানিক কারণ

চন্দ্রকলা ও চন্দ্রগ্রহণ: চাঁদের রূপ বদলানোর বৈজ্ঞানিক কারণ

চাঁদের রূপ বদলানোর রহস্য

চাঁদ কেন কখনো গোল, কখনো আধখানা, কখনো এক ফালি আবার কখনো একেবারেই দেখা যায় না? এই প্রশ্নটা সাধারণ মানুষের কৌতূহল জাগিয়েছে যুগ যুগ ধরে। আসলে বিষয়টা খুব সরল, কিন্তু তার পেছনে আছে সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদের কক্ষপথের নিখুঁত জ্যামিতি।

পৃথিবী যেমন সূর্যকে ঘিরে প্রদক্ষিণ করছে, তেমনি চাঁদও পৃথিবীকে ঘিরে ঘুরছে। পৃথিবী সূর্যের একটি গ্রহ, আর চাঁদ পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহ। চাঁদের নিজস্ব কোনো আলো নেই। সূর্যের আলো চাঁদের উপর পড়ে প্রতিফলিত হলে, চন্দ্রপৃষ্ঠের যে অংশ আলোকিত হয়, আমরা কেবল সেই অংশটুকুই দেখতে পাই।

এখন প্রশ্ন হলো, এই আলোকিত অংশটা কেন সব সময় সমান দেখা যায় না? অনেকেই মনে করেন, পৃথিবীর ছায়া চাঁদের উপর পড়ার কারণেই চাঁদ বড় ছোট দেখায়। এটি একটি প্রচলিত কিন্তু ভুল ধারণা। বাস্তবে চাঁদের বাড়া কমার কারণ পৃথিবীর ছায়া নয়; আসল কারণ হলো—চাঁদের কক্ষপথে অবস্থান বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে আলোকিত অংশের দৃশ্যমান পরিমাণ পরিবর্তিত হওয়া।

পূর্ণিমা ও অমাবস্যা: আলো-ছায়ার খেলা

চাঁদ যখন পৃথিবীকে ঘিরে ঘোরে, তখন প্রতি রাতে সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদের পারস্পরিক কৌণিক অবস্থান একটু একটু করে বদলে যায়। ফলে চাঁদের আলোকিত অর্ধগোলকের কতটুকু অংশ আমরা দেখতে পাচ্ছি, সেটাও বদলে যায়। একেই বলা হয় চন্দ্রকলা ও চন্দ্রগ্রহণ-এর জ্যামিতিক ভিত্তি।

  • পূর্ণিমা: যখন চাঁদের পুরো আলোকিত অংশ পৃথিবী থেকে দৃশ্যমান হয়, তখন তাকে বলা হয় পূর্ণিমা। এই সময় চাঁদ পৃথিবী থেকে সূর্যের ঠিক বিপরীত দিকে অবস্থান করে।
  • অমাবস্যা: পূর্ণিমার পরদিন থেকেই চাঁদের আলোকিত দৃশ্যমান অংশ ধীরে ধীরে কমতে থাকে। এই সময়টাকে বলা হয় কৃষ্ণপক্ষ। প্রায় ১৪-১৫ দিনের মধ্যে চাঁদের আলোকিত অংশ সম্পূর্ণভাবে আমাদের দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়। তখন চাঁদ অবস্থান করে সূর্য ও পৃথিবীর মাঝখানে, এবং চাঁদের আলোকিত দিকটি থাকে আমাদের উল্টো দিকে। ফলে চাঁদ দেখা যায় না। এই অবস্থাকে বলা হয় অমাবস্যা।

শুক্লপক্ষ ও কৃষ্ণপক্ষ

অমাবস্যার পর আবার দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করে। প্রতি রাতে চাঁদের আলোকিত অংশ একটু একটু করে আমাদের চোখে ধরা পড়ে। এই পর্যায়কে বলা হয় শুক্লপক্ষ।

প্রায় ১৫ দিন ধরে চাঁদের উজ্জ্বল অংশ বাড়তে বাড়তে আবার পূর্ণিমায় পৌঁছায়। এভাবেই প্রতি মাসে চন্দ্রকলার ক্ষয় ও বৃদ্ধি ঘটে। এটি আলো ও ছায়ার খেলা নয়, বরং সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদের কৌণিক সম্পর্কের দৃশ্যমান ফল। আবহমান কাল থেকে এভাবেই চাঁদের বাড়া কমার ছন্দ চলে আসছে।

চন্দ্রগ্রহণ কেন হয়?

মাঝে মাঝে পূর্ণিমার রাতে সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদ প্রায় একই সরলরেখায় অবস্থান করে। তখন পৃথিবীর ছায়া চাঁদের উপর পড়ে, এবং চন্দ্রগ্রহণ ঘটে। তবে এটা সব পূর্ণিমার রাতেই হয় না।

এর কারণ হলো, চাঁদের কক্ষপথ পৃথিবীর কক্ষপথের সঙ্গে সম্পূর্ণ একই সমতলে নয়। দু’টি কক্ষপথের মধ্যে প্রায় ৫ ডিগ্রি কৌণিক ব্যবধান রয়েছে। পূর্ণিমার সময় চাঁদ যদি এই দুই কক্ষপথের মিলনবিন্দুর বা ‘নোড’-এর কাছাকাছি অবস্থান করে, তবেই চন্দ্রগ্রহণ ঘটে।

২০২৬ সালের চন্দ্রগ্রহণ ও বাংলাদেশ

এই কারণেই বছরে সাধারণত দুই থেকে তিনবার চন্দ্রগ্রহণ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সুখবর হলো, ২০২৬ সালে দুটি চন্দ্রগ্রহণ ঘটবে:

  • ২ মার্চ ২০২৬: পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ।
  • ২৭ অগাস্ট ২০২৬: আংশিক চন্দ্রগ্রহণ।

আকাশ পরিস্কার থাকলে দুটো চন্দ্রগ্রহণই ঢাকা সহ বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে দেখা যাবে। মহাকাশের এই অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য দেখার জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে পারেন।

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular