শীতল যুদ্ধের ইতিহাস ও অ্যাপোলো
ষাটের দশক। শীতল যুদ্ধের উত্তাপে কাঁপছে সারা পৃথিবী। বিভিন্ন দেশে প্রভাব সৃষ্টির পাশাপাশি দুই পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে চলছে মহাকাশ জয়কে কেন্দ্র করে চন্দ্র অভিযান নিয়ে তীব্র এক প্রতিযোগিতা।
১৯৫৭ সালের অক্টোবর মাসে সোভিয়েতরা পাঠাল স্পুটনিক, মহাকাশে প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ। এর চার বছরের কম সময়ে, ১৯৬১ সালের এপ্রিল মাসে সোভিয়েত নভোচারী ইউরি গাগারিন মহাকাশে প্রথম মানব হিসেবে ইতিহাস রচনা করলেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের এই সাফল্যে আমেরিকা যেন হোঁচট খেল। ১৯৬১ সালের মে মাসেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডি ঘোষণা দিলেন, যে করেই হোক আগামী দশ বছরের মধ্যে তারা মানুষকে চাঁদে পাঠাবে।
১৯৬৯ সালের জুলাইয়ে আমেরিকার সেই স্বপ্ন সফল হলো। অ্যাপোলো ১১ মিশনের নভোচারী নীল আর্মস্ট্রং প্রথম মানুষ হিসেবে চাঁদের বুকে পা রাখলেন। এরপর ১৯৭২ সাল পর্যন্ত মোট ছয়বার আমেরিকান নভোচারীরা চাঁদে গেছেন, কিন্তু সোভিয়েতরা চাঁদে মানুষ পাঠাতে পারেনি। তারা সীমাবদ্ধ থেকেছে রোবটিক মহাকাশযান পাঠানো ও চাঁদ থেকে নমুনা সংগ্রহে।
বিরতি ও একুশ শতকের নতুন দৌড়ঝাঁপ
সেই সময় জাতীয় গৌরব আর রাজনৈতিক আধিপত্য দেখানোই ছিল চন্দ্রাভিযানের মূল লক্ষ্য। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা বেশিদিন চলেনি। একদিকে বিপুল ব্যয়, অন্যদিকে চন্দ্র বিজয়ের রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণ হয়ে যাওয়ায় ১৯৭২ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপোলো কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নও অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে তাদের চন্দ্র অভিযান কর্মসূচি গুটিয়ে নেয়। এরপর প্রায় অর্ধশতক ধরে চাঁদ শুধু আমাদের রাতের আকাশের আলোকিত প্রতিবেশী, দূর থেকে দেখা মায়া জাগানো এক স্বপ্ন।
কিন্তু বর্তমানে একুশ শতকে এসে আবার চন্দ্র বিজয়ের জন্য নতুন করে দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে। এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মুখোমুখি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন।
নাসার আর্টেমিস প্রোগ্রাম
নাসা হাতে নিয়েছে আর্টেমিস প্রোগ্রাম। এই কর্মসূচি অনুযায়ী:
- ২০২৬ সাল: আর্টেমিস-২ মিশনে যুক্তরাষ্ট্রের নভোচারীরা চাঁদের কক্ষপথ ঘুরে পৃথিবীতে ফিরে আসবেন, তবে তারা তখনো চন্দ্রপৃষ্ঠে নামবেন না।
- ২০২৭ সাল: পরিকল্পনা অনুযায়ী আর্টেমিস-৩ মিশন চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে মানুষ অবতরণের লক্ষ্য নিয়েই পাঠানো হবে।
তবে আমেরিকার এই উচ্চাভিলাসী লক্ষ্য আগামী দুই বছরের মধ্যে আদৌ পূরণ হবে কিনা সেটা নিয়ে খোদ আমেরিকার বিজ্ঞানীরাই প্রশ্ন তুলেছেন।
চীনের চাং’ই মিশনের চমক
অন্যদিকে চীন তাদের চাং’ই মহাকাশযানের মাধ্যমে ইতিমধ্যেই চমক দেখিয়েছে। চীনের চাং’ই সিরিজের মহাকাশযান এ পর্যন্ত তিনবার সফলভাবে চাঁদের বুকে অবতরণ করতে পেরেছে। শুধু তাই নয়, চাং’ই-৫ চাঁদের অপর পৃষ্ঠ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে এনেছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের পর চীন হচ্ছে তৃতীয় দেশ, যারা চাঁদ থেকে সরাসরি মাটি ও পাথরের নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে নিয়ে আসতে পেরেছে।
এর পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে মানুষকে চাঁদে পাঠানোর ঘোষণাও দিয়েছে চীন। তবে তাদের পরিকল্পনা আরও সুদূরপ্রসারী। তারা চাঁদে একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে, যেখানে রাশিয়া এবং অন্যান্য দেশও চীনের সহযোগী হবে।
মহাকাশ রাজনীতি ও জোট গঠন
এখন প্রশ্ন হলো, চন্দ্র বিজয় কি শুধুই একটি প্রতিযোগিতা, নাকি এর ভেতরে অন্য কোন সম্ভাবনা রয়েছে? যুক্তরাষ্ট্র আর চীনের মধ্যে প্রযুক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্পষ্ট। কিন্তু আর্টেমিস অ্যাকর্ডসের মাধ্যমে আমেরিকা তার মিত্র দেশগুলোকে কাছে টানছে। অপরদিকে চীন আবার তৈরি করছে নিজস্ব জোট।
তবে বাস্তবতা হলো, চাঁদে দীর্ঘমেয়াদি ঘাঁটি গড়তে গেলে যে বিপুল খরচ ও প্রযুক্তি দরকার হবে, সেটা একা বহন করা কঠিন। তাই শেষ পর্যন্ত সহযোগিতার পথ খোলা থাকতেই হবে। যেমনভাবে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন আইএসএস গড়ে উঠেছিল বহু দেশের যৌথ প্রচেষ্টায়, ঠিক তেমনি ভবিষ্যতে চাঁদও হতে পারে মানবজাতির যৌথ গবেষণাগার।
চাঁদের বুকে কেন এই তাড়াহুড়া?
কিন্তু এত বছর পর হঠাৎ কেন এত তাড়াহুড়া চাঁদকে নিয়ে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে চন্দ্র সম্পদে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন:
- পানি ও অক্সিজেন: চন্দ্রপৃষ্ঠে পানি বরফ আকারে রয়েছে, যেটা ভেঙে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন ও হাইড্রোজেন পাওয়া যাবে। ভবিষ্যতে চাঁদে উপনিবেশ স্থাপন করা হলে এই অক্সিজেন লাগবে মানুষের জীবন ধারণের জন্য।
- জ্বালানি: পানির হাইড্রোজেন হবে রকেটের জ্বালানির উপাদান।
- হিলিয়াম-৩: সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো হিলিয়াম-৩ নামের এক বিরল আইসোটোপ। পৃথিবীতে এর মজুত প্রায় নেই, কিন্তু চাঁদে আছে প্রচুর। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, হিলিয়াম-৩ ব্যবহার করে পারমাণবিক ফিউশন থেকে সীমাহীন ও পরিচ্ছন্ন শক্তি পাওয়া যাবে।
এছাড়া চাঁদে টাইটানিয়াম আর বিরল খনিজ উপাদানও আছে, যেটা আধুনিক প্রযুক্তি শিল্পের জন্য অমূল্য। চাঁদ তাই হয়ে উঠছে আগামী শতকের সম্ভাব্য স্বর্ণখনি।
আন্তর্জাতিক আইন ও ভবিষ্যৎ সংঘাত
তবে চাঁদ নিয়ে শুধু প্রযুক্তি বা সম্পদের প্রতিযোগিতাই নয়, রয়েছে আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্নও। ১৯৬৭ সালের আউটার স্পেস ট্রিটিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, মহাকাশ কিংবা চাঁদ কোনো একক দেশের সম্পত্তি হতে পারে না, এগুলো মানবজাতির যৌথ ঐতিহ্য।
পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র তাদের আর্টেমিস অ্যাকর্ডসের মাধ্যমে মিত্র দেশগুলোকে পাশে টানতে শুরু করেছে, যেখানে চাঁদের সম্পদ ব্যবহারের নীতিমালা আরও স্পষ্ট করার চেষ্টা চলছে। যদিও চীন ও রাশিয়া এই অ্যাকর্ডস মানেনি এবং তারা গড়ছে আলাদা জোট, তবুও সহযোগিতার দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ভবিষ্যতে চাঁদের সম্পদ ভাগাভাগি নিয়ে মতপার্থক্য দেখা দিতে পারে, কিন্তু একইসঙ্গে নতুন সহযোগিতার পথও খুলে যেতে পারে।
কারণ মহাকাশ এত বিস্তৃত আর চাঁদ এত সম্ভাবনাময় যে এককভাবে কোনো দেশই একে পুরোপুরি দখলে নিতে পারবে না। এখনো পর্যন্ত বড় কোনো সংঘাত না হলেও প্রযুক্তি, অর্থনীতি আর ভূরাজনীতির টানাপোড়েনের পাশাপাশি রয়েছে যৌথ উদ্যোগের সম্ভাবনাও। তাই প্রশ্ন থেকে যায়, চাঁদ কি মানবজাতির নতুন সংঘাতের ক্ষেত্র হবে, নাকি হয়ে উঠবে এক অভিন্ন স্বপ্নপূরণের স্থান, যেখানে গোটা পৃথিবী একসাথে মিলেমিশে কাজ করবে। অদূর ভবিষ্যতেই এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে।
