আমাদের গ্যালাক্সি ও অবস্থান
আমাদের গ্যালাক্সির নাম মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি। বাংলায় একে বলা হয় আকাশগঙ্গা ছায়াপথ। এটি একটি স্পাইরাল বা সর্পিল আকৃতির গ্যালাক্সি। এই বিশাল গ্যালাক্সির একটি স্পাইরাল বাহুর মধ্যেই আমাদের সূর্য তার পরিবার বা সৌরজগত নিয়ে বসবাস করে।
মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রটি আমাদের পৃথিবী থেকে প্রায় ২৫ হাজার আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। অর্থাৎ, আলোর গতিতে চললেও গ্যালাক্সির কেন্দ্র থেকে পৃথিবীতে আলো এসে পৌঁছাতে সময় লাগে ২৫ হাজার বছর।
ডার্ক হর্স নেবুলা: মহাকাশের কালো ঘোড়া
গ্যালাক্সির কেন্দ্রটি অত্যন্ত উজ্জ্বল হলেও এর বেশিরভাগ অংশই ঢাকা পড়ে আছে ঘন হাইড্রোজেনের মেঘে। ফলে এর প্রকৃত ঔজ্জ্বল্যের সামান্য অংশই আমাদের চোখে ধরা পড়ে।
ছায়াপথের এই উজ্জ্বল কেন্দ্রের কাছেই রয়েছে একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন নেবুলা বা নীহারিকা। এ যেন প্রদীপের নিচেই অন্ধকার। এই বিশেষ নীহারিকার নাম, ডার্ক হর্স নেবুলা (Dark Horse Nebula)। বাংলায় কাব্য করে একে বলা যায়, ‘মহাকাশের কালো ঘোড়া’।
আমার তোলা এই ছবিগুলো দেখুন। মহাকাশের কালো ঘোড়াটি সহজেই আপনার চোখে পড়বে। বিভিন্ন সময়ে এই ছবিগুলো অস্ট্রেলিয়ার রাতের আকাশে তুলেছিলাম। লোকালয় থেকে অনেক দূরে, আলোক দূষণহীন মেঘমুক্ত গভীর রাতে ছায়াপথের উজ্জ্বল কেন্দ্রটি খুব সহজেই শনাক্ত করা যায়। কেন্দ্র থেকে একটু দূরেই চোখে পড়ে মহাকাশের এই কালো ঘোড়াটিকে। খালি চোখেও এই নেবুলাটিকে সহজেই চেনা যায়।
কেন্দ্রের উজ্জ্বলতা ও ব্ল্যাকহোল রহস্য
এখানে বলে রাখি, আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্রটির অতি উজ্জ্বলতার পেছনে মূলত দুটি কারণ রয়েছে:
১. নক্ষত্রের ঘনত্ব: গ্যালাক্সির কেন্দ্রে নক্ষত্রের ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি। আমাদের সূর্য এবং তার আশেপাশে যে পরিমাণ নক্ষত্র রয়েছে, গ্যালাক্সির কেন্দ্রে নক্ষত্র রয়েছে তার চেয়ে ১০ মিলিয়ন গুণ বেশি। সুতরাং সেখানে আলোর উজ্জ্বলতাও অনেক বেশি হওয়াটাই স্বাভাবিক।
২. সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল: আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্রে রয়েছে একটি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল বা অতিভরের কৃষ্ণগহ্বর। এর ভর সূর্যের চেয়ে প্রায় ৪০ মিলিয়ন গুণ বেশি।
অ্যাক্রিশন ডিস্ক ও হাইড্রোজেনের মেঘ
এই বিশাল ব্ল্যাকহোলটিকে ঘিরে রয়েছে একটি ঘূর্ণায়মান ‘অ্যাক্রিশন ডিস্ক’ বা পরিবৃদ্ধি চক্র। এটি প্রচন্ড বেগে ঘুরছে। এই ঘূর্ণনের ফলে চক্রের ভেতরে অবস্থিত বস্তুকণা একে অপরের সাথে ঘর্ষণে উত্তপ্ত হয়ে তীব্র আলোক রশ্মি বিকিরণ করছে।
এই দুই সম্মিলিত কারণে আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্রটির উজ্জ্বলতা এতো বেশি। আগেই বলেছি, এই উজ্জ্বল আলোর বেশিরভাগ অংশই ঢাকা পড়ে আছে হাইড্রোজেনের ঘন মেঘের আড়ালে। এই মহাজাগতিক মেঘ না থাকলে আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্রটিকে পূর্ণিমার চাঁদের মতোই উজ্জ্বল মনে হতো। তখন পৃথিবীর প্রতিটি রাতই হতো পূর্ণিমার রাতের মতো আলোকোজ্জ্বল।
