Wednesday, January 14, 2026

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ওয়েব সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।  আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeপদার্থ বিজ্ঞানমেঘনাদ সাহা: নক্ষত্রের রহস্যভেদী ও সাহা সমীকরণ

মেঘনাদ সাহা: নক্ষত্রের রহস্যভেদী ও সাহা সমীকরণ

প্রারম্ভিক জীবন ও সংগ্রাম

ঢাকার অদূরে কালিয়াকৈরের কাছে শ্যাওড়াতলী নামে একটা গ্রাম আছে। সেই গ্রামে ১৮৯৩ সালে অসাধারণ একটি ছেলের জন্ম হয়েছিলো। ছেলেটির নাম মেঘনাদ সাহা। তাঁর বাবা ছিলেন মুদির দোকানদার। সংসারে ছিল অভাব-অনটন।

ছেলেটি যখন একটু বড় হলো, বাবা তাকে গ্রামের স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। কিন্তু লেখাপড়ার পাশাপাশি তাকে বাবার মুদির দোকানেও সাহায্য করতে হতো। দিনের বেলায় তার পড়াশোনা করার তেমন সুযোগ হতো না, তাই গভীর রাত পর্যন্ত কুপি জ্বালিয়ে ছেলেটি পড়াশোনা করতো।

অংকে তার মাথা ছিল পরিষ্কার, অসম্ভব মেধাবী ছিল সে। কিন্তু গ্রামের স্কুলে ক্লাস থ্রির বেশি পড়ার সুযোগ ছিল না। তাই বাবা তাকে দশ মাইল দূরে শিমুলিয়ায় একটি মিডল স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। সেখানে একজন চিকিৎসকের বাড়িতে থেকে সে পড়াশোনা করতো। বিনিময়ে তাকে বাড়ির যাবতীয় কাজ—বাসন কোসন মাজা থেকে শুরু করে গরু বাছুর পালা, সবই করতে হতো। কিন্তু ছেলেটির অধ্যবসায়ের কোন অভাব ছিল না। সবাইকে অবাক করে দিয়ে মেধাবী সেই ছেলেটি এন্ট্রান্স পরীক্ষায় ঢাকা বিভাগে প্রথম হয়ে গেল।

স্বদেশী আন্দোলন ও শিক্ষা জীবন

সরকারি বৃত্তি নিয়ে ঢাকা শহরে এসে সে ভর্তি হলো কলেজিয়েট স্কুলে। ঢাকায় এসে পড়াশোনার পাশাপাশি সে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়লো। ব্রিটিশ বিরোধী স্বদেশী আন্দোলন তখন তুঙ্গে। মেঘনাদ সাহাও জড়িয়ে পড়ল সেই আন্দোলনে।

এর ফলে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে সে বহিস্কৃত হলো এবং তার সরকারি বৃত্তিও বাতিল হয়ে গেল। ছেলেটি পড়লো মহা বিপদে। কিন্তু তার বিপদে এগিয়ে এলেন একজন শিক্ষক। তাঁর সহায়তায় মেঘনাদ সাহা ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করলেন।

এরপর কলকাতায় এসে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হলেন তিনি। এখানে সহপাঠী হিসেবে পেলেন আরেক কিংবদন্তি সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে। পরবর্তীতে মেঘনাদ সাহা এবং সত্যেন্দ্রনাথ বসু যৌথভাবে এমএসসি পরীক্ষাতে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়েছিলেন। তারপর তাঁরা দুজনেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। কয়েক বছর পর মেঘনাদ সাহা একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। আর সত্যেন্দ্রনাথ বসু কলকাতা ছেড়ে নব্য স্থাপিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে যোগদান করেন।

সাহা সমীকরণ: এক যুগান্তকারী আবিষ্কার

ডক্টর মেঘনাদ সাহা ফলিত গণিতের ছাত্র হলেও জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে মৌলিক গবেষণা করে জগৎ বিখ্যাত হয়েছিলেন। সে সময়ের বিজ্ঞানীরা নক্ষত্রের ভৌত রাসায়নিক গঠন নিয়ে গবেষণা করছিলেন।

১৯২০ সালে মেঘনাদ সাহাই সর্বপ্রথম তাঁর উদ্ভাবিত ‘থার্মাল আয়োনাইজেশন’ সমীকরণের সাহায্যে নক্ষত্রের পারমাণবিক গঠনের ব্যাখ্যা দেন। সৌররশ্মির তাপমাত্রা বিশ্লেষণ করে তাঁর সমীকরণের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে:

  • সূর্য মূলত হাইড্রোজেন এবং হিলিয়াম দিয়ে তৈরি।
  • সূর্যের মধ্যে ভারী মৌলের পরিমান অতি সামান্য।

অনান্য নক্ষত্রের ক্ষেত্রেও তাঁর সমীকরণ প্রয়োগ করে তাদের ভৌত রাসায়নিক গঠন সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া গেছে। জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানে “সাহা সমীকরণ” একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তাঁর অমূল্য অবদানের জন্য মেঘনাদ সাহা ১৯২৭ সালে ব্রিটিশ রয়্যাল সোসাইটির ফেলো (FRS) নির্বাচিত হন।

নোবেল বঞ্চনা

মেঘনাদ সাহাকে নোবেল প্রাইজ দেওয়ার জন্য একাধিকবার প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে প্রতিবারই তাকে নোবেল পুরস্কার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিলো। সম্ভবত সে সময় পরাধীন দেশের নাগরিক হবার কারণেই তিনি এই স্বীকৃতি পাননি। একইভাবে তাঁর বন্ধু ও সহকর্মী সত্যেন্দ্রনাথ বসুকেও নোবেল পুরস্কার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিলো।

দেশগঠন ও রাজনীতি

পরবর্তী জীবনে মেঘনাদ সাহা এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি কলকাতায় ‘ইনস্টিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স’ স্থাপন করেছিলেন, যা পরবর্তীতে ‘সাহা ইনস্টিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স’ হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছে।

অধ্যাপনা ও গবেষণার পাশাপাশি তিনি ছিলেন রাজনীতিতেও সক্রিয়। ভারতীয় লোকসভায় সদস্য হিসেবে তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া কোন দেশে বিজ্ঞানকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এজন্যই তিনি রাজনীতিতে পদার্পণ করেছিলেন। ভারতীয় প্ল্যানিং কমিশনের একজন সদস্য হিসাবেও মৌলিক বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে তিনি অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন।

উপসংহার

১৯৫৬ সালে এই ক্ষণজন্মা বিজ্ঞানীর জীবনাবসান হয়। নক্ষত্রের মতোই উজ্জ্বল ছিল তাঁর বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি।

বিংশ শতাব্দীতে আমাদের উপমহাদেশের বেশ কয়েকজন প্রতিভাবান বিজ্ঞানী তাঁদের অনন্য অবদানের জন্য বিশ্বব্যাপী খ্যাতি লাভ করেছিলেন। তাঁদের অনেকেরই জন্ম হয়েছিলো আমাদের বাংলাদেশে। অথচ বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই এখন তাঁদের কথা জানেনা। আমাদের তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তুলতে হলে বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে মেঘনাদ সাহার মতো বিজ্ঞানীদের অবদানের কথা জানাটা খুবই প্রয়োজন।

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular