জিনোমের মানুষ ও আন্তর্জাতিক খ্যাতি
১৯৫৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর মাদারীপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন বাংলাদেশের গর্ব, বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলম। একজন সফল জিনোম বিজ্ঞানী হিসেবে তিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করেছিলেন। তাঁর সাফল্যের পরিধি শুধু বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ ছিল না; যুক্তরাষ্ট্র থেকে মালয়েশিয়া—বিশ্বের নানা প্রান্তে তিনি রেখে গেছেন তাঁর মেধার স্বাক্ষর।
প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রে পেঁপে এবং পরে মালয়েশিয়ায় রাবার জিনোম সিকোয়েন্স করার পর বাংলাদেশে ফিরে এসে তিনি পাটের পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্স করেন। এর পাশাপাশি তিনি পাটের একটি ক্ষতিকর ছত্রাকের জিনোম সিকোয়েন্স করতেও সক্ষম হন। এটি ছিল বাংলাদেশে বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে একটি বিশাল মাইলফলক।
শিক্ষা ও গবেষণার ভিত্তি
বাংলাদেশে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করার পর, মাকসুদুল আলম বৃত্তি নিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমান। তাঁর শিক্ষাজীবন ছিল বৈচিত্র্যময়:
- ১৯৭৯: রাশিয়ার মস্কো ইউনিভার্সিটি থেকে মাইক্রোবায়োলজিতে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন।
- ১৯৮২: একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাইক্রোবায়োলজিতে পিএইচডি ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।
- ১৯৮৭: জার্মানির বিখ্যাত ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট থেকে বায়োকেমিস্ট্রিতে দ্বিতীয় পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
হাওয়াই এবং পেঁপে গবেষণা
পরবর্তী বছরগুলোতে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ হাওয়াই, মানওয়ায় অধ্যাপক হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। এখানে অধ্যাপনার সময়ই তিনি জিনোম সিকোয়েন্সের প্রতি গভীরভাবে আগ্রহী হন। সে সময় প্রাথমিকভাবে একটি হ্যালোফাইটিক ব্যাকটেরিয়ার জিনোম সিকোয়েন্স করতে তিনি সমর্থ হন।
জীববৈচিত্র্যের মূলে রয়েছে জিনের তারতম্য। কোনো জীবের সমস্ত জিনকে শনাক্ত করতে হলে প্রথমে তার পুরো জিনোমকে সিকোয়েন্স করা প্রয়োজন। জিনোম সিকোয়েন্স মানে হলো শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ডিএনএ অণুর ভেতর নাইট্রোজেন বেইসগুলো কীভাবে সাজানো রয়েছে সেটা বের করা। এটা জানা গেলে, কোনো জীবের সমস্ত রহস্য উন্মোচন করা সম্ভব।
২০০৭ সালে তিনি হাওয়াই দ্বীপে পেঁপের জিনোম সিকোয়েন্স করেন। হাওয়াইয়ের অর্থনীতিতে পেঁপের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। রোগমুক্ত পেঁপে আবাদের ক্ষেত্রে তাঁর এই আবিষ্কারটি সেখানকার কৃষকদের জন্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মালয়েশিয়ায় রাবার ও বাংলাদেশে পাটের জিনোম
পরবর্তীতে মালয়েশিয়া সরকার তাঁকে তাদের দেশের একটি প্রধান অর্থকরী ফসল রাবার গাছের জিনোম সিকোয়েন্স করার কাজে নিযুক্ত করেছিল। এই কাজটি তিনি স্বল্প সময়ে সফলতার সাথে সম্পন্ন করেন।
বিভিন্ন দেশে তাঁর করা জিনোম সিকোয়েন্সের সাফল্য দেখে বাংলাদেশ সরকার ২০০৯ সালে তাঁকে বাংলাদেশের প্রধান অর্থকরী ফসল পাটের জিনোম সিকোয়েন্স করার গুরুদায়িত্ব দেন। তিনি তাঁর অসাধারণ মেধা এবং প্রজ্ঞার সাহায্যে কঠিন এই গবেষণার কাজটি অল্প সময়ের মধ্যেই শেষ করেন।
- প্রথমে তোষা পাটের জীবনরহস্য উন্মোচন করেন।
- এরপর দেশি পাটের জিনোম সিকোয়েন্স করতেও সমর্থ হন।
- সর্বশেষ তিনি পাটের একটি ক্ষতিকর ফাঙ্গাসের জিনোমও সিকোয়েন্স করে ফেলেন।
পাটের জিনোম নিয়ে তাঁর এসব কাজ দেশে-বিদেশে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল।
অকাল প্রয়াণ ও সম্মাননা
২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসে ক্ষণজন্মা এই বিজ্ঞানী হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং মাত্র ৬০ বছর বয়সেই পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে যান। বিভিন্ন উদ্ভিদের জিনোম সিকোয়েন্সের ক্ষেত্রে তাঁর অনন্য অবদান জীববিজ্ঞানের জগতে স্মরণীয় হয়ে আছে।
পাটের জিনোম গবেষণায় অনন্য অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার ডক্টর মাকসুদুল আলম-কে স্বাধীনতা পুরস্কারে (মরণোত্তর) ভূষিত করেছেন। এটি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা। ইউনিভার্সিটি অফ হাওয়াই তাঁর সম্মানে একটি জিনোম গবেষণা তহবিল স্থাপন করেছে। জিনোম গবেষণার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন একজন অগ্রপথিক। এদেশের বিজ্ঞানীদের কাছে তিনি সাফল্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছেন।
পাদটীকা: ব্যক্তিগত স্মৃতি
ডক্টর মাকসুদুল আলমের সাথে ছাত্রজীবনে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় হয়েছিল। ওনার ছোট ভাই প্রয়াত মাহবুবুল আলম (বাবু) গভ: ল্যাবরেটরি স্কুলে আমার সহপাঠী ছিল। সেই সুবাদে মাকসুদ ভাই কিছুদিন আমার গৃহশিক্ষক ছিলেন। তখন তিনি ছিলেন ঢাকা কলেজের ছাত্র। এর কিছুদিন পরই তিনি উচ্চ শিক্ষার্থে মস্কো চলে যান।
মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে তিনি দেশে এসেছিলেন। এটা সম্ভবত ১৯৭৫ সালের প্রথম দিকের কথা। সে সময় স্কুলের সহপাঠীদের অনেকেই আমরা বাবুদের লালবাগের বাসায় গিয়ে মাকসুদ ভাইয়ের সাথে দেখা করেছিলাম। উনি আমাদের ‘অনুসন্ধানী বিজ্ঞান ক্লাব’-এর প্রতিষ্ঠাতা-উপদেষ্টা ছিলেন। বাংলাদেশে কিশোর ও তরুণদের মধ্যে বিজ্ঞানের চর্চা বাড়ানোর লক্ষ্যে অনুসন্ধানী বিজ্ঞান ক্লাবের সূচনাটি মূলত তাঁর হাত ধরেই হয়েছিল।
