স্যার জে জে থমসন—নামটি শুনলেই আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের এক ঐতিহাসিক মোড়ের কথা মনে পড়ে। আজ আমরা যে ইলেকট্রনকে পদার্থের একটি মৌলিক কণা হিসেবে জানি, সেই ধারণাটিকে প্রথমবারের মতো দৃঢ় বৈজ্ঞানিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছিলেন এই মানুষটিই। উনিশ শতকের শেষ ভাগে, যখন পরমাণুকে অবিভাজ্য বলে মনে করা হতো, তখন থমসন সাহস করে বলেছিলেন, পরমাণুর ভেতরেও আরও ক্ষুদ্র কিছু রয়েছে।
১৮৫৬ সালের ১৮ ডিসেম্বর ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারে জন্ম নেওয়া জোসেফ জন থমসন ছিলেন ছোটবেলা থেকেই অসাধারণ মেধার অধিকারী। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাভেনডিশ ল্যাবরেটরিতে কাজ করতে গিয়ে তিনি এমন এক পরীক্ষায় হাত দেন, যেটা পরবর্তীতে পুরো বিজ্ঞানচর্চার গতিপথই বদলে দেয়।
ক্যাথোড রে এবং যুগান্তকারী পরীক্ষা
থমসনের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ক্যাথোড রে। ভ্যাকুয়াম টিউবের ভেতরে বিদ্যুৎ প্রবাহিত করলে যে অদ্ভুত আলো দেখা যায়, এটাই সেই রশ্মি। থমসন সূক্ষ্মভাবে লক্ষ্য করলেন, এই ক্যাথোড রশ্মিকে বৈদ্যুতিক ও চৌম্বক ক্ষেত্র দিয়ে বাঁকানো যায়।
শুধু তাই নয়, রশ্মির আচরণ দেখে তিনি বুঝতে পারলেন, এটি কোনো আলো নয়, বরং ঋণাত্মক চার্জযুক্ত অতিক্ষুদ্র কণার স্রোত। তিনি এই কণার চার্জ ও ভরের অনুপাত হিসেব করে বের করলেন, এর ভর হাইড্রোজেন পরমাণুর চেয়েও হাজার গুণ কম। ১৮৯৭ সালে তিনি ঘোষণা করলেন, এই কণাই হলো ইলেকট্রন। সেই মুহূর্তে পরমাণু আর অবিভাজ্য রইল না।
প্লাম পুডিং মডেল ও পরমাণুর গঠন
ইলেকট্রন আবিষ্কারের পর জে জে থমসন পরমাণুর গঠন বোঝাতে একটি মডেল প্রস্তাব করেন। তিনি বললেন, পরমাণু যেন এক ধরনের ধনাত্মক চার্জের পুডিং, যার ভেতরে কিশমিশের মতো ছড়িয়ে আছে ঋণাত্মক ইলেকট্রন।
বিজ্ঞানের ইতিহাসে এটি পরিচিত “প্লাম পুডিং মডেল” নামে। আজ আমরা জানি, এই মডেল পুরোপুরি সঠিক নয়, কিন্তু এটিই ছিল পরমাণুর অভ্যন্তরীণ গঠনের প্রথম বাস্তব ধারণা।
শিক্ষকতা ও নোবেল জয়
থমসনের অবদান কেবল ইলেকট্রন আবিষ্কারেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন এক অসাধারণ শিক্ষকও। তাঁর হাত ধরেই গড়ে উঠেছেন আর্নেস্ট রাদারফোর্ডের মতো বিজ্ঞানী, যিনি পরে পরমাণুর নিউক্লিয়াসের ধারণা দেন।
মজার ব্যাপার হলো, শিক্ষক থমসন পরমাণুর ভেতরে নিউক্লিয়াস মানেননি, আর ছাত্র রাদারফোর্ডই সেই ধারণা প্রতিষ্ঠা করেন। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এমন প্রজন্মান্তরের বিতর্কই জ্ঞানের অগ্রগতির আসল সৌন্দর্য।
১৯০৬ সালে ইলেকট্রন আবিষ্কারের জন্য স্যার জে জে থমসন পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। তাঁর কাজ আমাদের দেখিয়েছে, প্রকৃতিকে বোঝার জন্য সাহসী প্রশ্ন আর ধৈর্যশীল পরীক্ষা কতটা জরুরি। আজকের ইলেকট্রনিক্স, কম্পিউটার, আধুনিক প্রযুক্তি—এসব কিছুর গভীরে যে ইলেকট্রনের নীরব উপস্থিতি, তার পথচলা শুরু হয়েছিল থমসনের সেই ক্যাথোড রে টিউব থেকে।
এই কারণেই স্যার জে জে থমসন শুধু একজন বিজ্ঞানী নন, তিনি আধুনিক বিজ্ঞানের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এক নীরব বিপ্লবী। আজ ১৮ ডিসেম্বর, ক্ষণজন্মা এই বিজ্ঞানীর জন্মদিনে তাঁর প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।
