Thursday, January 15, 2026

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ওয়েব সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।  আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeমহাকাশ বিজ্ঞানওয়ার্প ড্রাইভ: আলোর গতির চেয়ে দ্রুত ভ্রমণ কি সম্ভব?

ওয়ার্প ড্রাইভ: আলোর গতির চেয়ে দ্রুত ভ্রমণ কি সম্ভব?

আমাদের ছোটবেলায় বিনোদনের একমাত্র ভরসা ছিল বিটিভি। তখন সেখানে বেশ কিছু চমৎকার ইংরেজি সিরিজ দেখানো হতো। এর মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় ছিল “স্টার ট্রেক।” সেই সিরিজের মহাকাশচারীরা ‘স্টারশিপ এন্টারপ্রাইজ’ নামের যানে চড়ে গ্যালাক্সির এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়াতেন। সেখানে নতুন গ্রহে সমস্যা এবং বুদ্ধি খাটিয়ে তা সমাধানের গল্পগুলো ছিল দারুণ রোমাঞ্চকর।

তবে সবচেয়ে অবাক করা বিষয় ছিল তাদের মহাকাশযানের গতি। এটি আলোর গতির চেয়েও দ্রুত চলতে পারত। চোখের নিমেষে গ্যালাক্সির এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে যাওয়ার এই প্রযুক্তির নাম ছিল ওয়ার্প ড্রাইভ। তখন আমরা ভাবতাম, এসব শুধুই কল্পকাহিনী। কিন্তু বাস্তবে কি আলোর গতির চেয়ে বেশি গতিতে চলা বা ‘সুপার ল্যুমিনাল ট্রাভেল’ সম্ভব?

আপেক্ষিকতার তত্ত্ব ও গতির সীমাবদ্ধতা

আইনস্টাইন তাঁর আপেক্ষিকতার তত্ত্বে বলেছিলেন, আলোর গতিই বস্তুর সর্বোচ্চ গতিসীমা। আলোর গতি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় তিন লক্ষ কিলোমিটার। তত্ত্ব অনুযায়ী, এর চেয়ে বেশি গতিতে কোনো বস্তু চলতে পারে না।

যদি কোনো বস্তু আলোর গতিতে চলার চেষ্টা করে, তবে তার ভর অসীম হয়ে যাবে। একই সঙ্গে সময় থেমে যাবে এবং দৈর্ঘ্য সংকুচিত হবে। অর্থাৎ, বাস্তব জগতে সাধারণ উপায়ে আলোর গতি অতিক্রম করা সম্ভব নয়। বর্তমানে মানুষের তৈরি সবচেয়ে দ্রুতগতির মহাকাশযান হলো “ভয়েজার ২”। এর গতি প্রতি সেকেন্ডে ১৫.৪ কিলোমিটার। এই গতিতে আমাদের নিকটতম নক্ষত্র ‘প্রক্সিমা সেন্টারাই’-এ পৌঁছাতে সময় লাগবে প্রায় ৭০ হাজার বছর। অথচ আলোর গতিতে গেলে সময় লাগত মাত্র সাড়ে চার বছর।

ওয়ার্প ড্রাইভ: কল্পকাহিনী থেকে গাণিতিক মডেলে

মহাশূন্যের এই বিশাল দূরত্ব পাড়ি দেয়ার জন্য মানব মস্তিষ্ক একটি তাত্ত্বিক সমাধান খুঁজে বের করেছে। ১৯৯৪ সালে মেক্সিকান পদার্থবিদ মিগুয়েল এলকুবিয়ের আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব ব্যবহার করে একটি গাণিতিক মডেল প্রস্তাব করেন। এই মডেলটি তত্ত্বগতভাবে আলোর গতির চেয়েও দ্রুত মহাকাশ ভ্রমণের পথ দেখায়।

এলকুবিয়ের দেখালেন, মহাকাশযান নিজে আলোর চেয়ে দ্রুত না ছুটলেও ওয়ার্প ড্রাইভ ব্যবহার করে দ্রুত ভ্রমণ সম্ভব। এই পদ্ধতিতে মহাকাশযানের সামনের স্থান-কালকে (স্পেসটাইম) সংকুচিত এবং পেছনের দিককে প্রসারিত করা হয়। এর ফলে যানের চারপাশে একটি “ওয়ার্প বাবল” তৈরি হয়। মহাকাশযানটি তখন স্পেসটাইমের এই ভাঁজ বা ঢেউ বেয়ে এগিয়ে চলে। এটি অনেকটা মহাকাশ ভ্রমণের একটি ‘শর্টকাট’ রাস্তা। এখানে আইনস্টাইনের কোনো প্রাকৃতিক নিয়মও ভঙ্গ হয় না।

একটি সহজ উদাহরণ

বিষয়টি বোঝার জন্য একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। মনে করুন, একটি বিশাল কার্পেটের মাঝখানে একটি চায়ের কাপ রাখা আছে। আপনি কাপটি আনতে চান। এটি করার দুটি উপায় আছে: ১. আপনি কার্পেটের ওপর দিয়ে হেঁটে গিয়ে কাপটি আনতে পারেন। ২. অথবা, আপনি কার্পেটটি গুটিয়ে কাপটিকে নিজের কাছে টেনে আনতে পারেন।

এলকুবিয়েরের তত্ত্বে এই দ্বিতীয় পদ্ধতিটিই ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ, আপনাকে কষ্ট করে গন্তব্যে যেতে হবে না, বরং গন্তব্যই আপনার কাছে চলে আসবে। তিনি নেগেটিভ এনার্জি ব্যবহার করে স্থান-কালের চাদরকে আলোর গতির চেয়ে দ্রুত গুটিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এখানে মনে রাখা জরুরি যে, আলোর সর্বোচ্চ গতিসীমা বস্তুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলেও, স্থান-কালের প্রসারণ বা সংকোচনের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়। মহাবিশ্বের সৃষ্টির সময়ও স্থান-কাল আলোর চেয়ে দ্রুতগতিতে প্রসারিত হয়েছিল।

চ্যালেঞ্জ এবং আধুনিক বিজ্ঞানের নতুন মোড়

এলকুবিয়েরের মডেলে প্রধান সমস্যা ছিল “নেগেটিভ এনার্জি”। বিশাল পরিমাণে নেগেটিভ এনার্জি উৎপাদন করা কার্যত অসম্ভব। ক্যাসিমির এফেক্টে এর সামান্য প্রমাণ মিললেও, তা ওয়ার্প ড্রাইভ চালানোর জন্য যথেষ্ট নয়। ফলে দীর্ঘদিন এই তত্ত্ব বাস্তবে প্রয়োগ করা যাচ্ছিল না।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিজ্ঞানীরা নতুন আশার আলো দেখিয়েছেন। ২০২১ সালে দুই বিজ্ঞানী, এলেক্সি ববরিক ও জিয়ান্নি মার্ত্রিরে একটি নতুন গাণিতিক মডেল উপস্থাপন করেন। তাঁরা দেখান, শুধুমাত্র পজিটিভ এনার্জি বা সাধারণ শক্তি ব্যবহার করেও ওয়ার্প বাবলের কাঠামো তৈরি করা সম্ভব। যদিও এর জন্য প্রয়োজনীয় শক্তির পরিমাণ এখনও অনেক বেশি, তবুও এটি বিজ্ঞানের জগতে নতুন উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে।

২০২৫ সালের অগ্রগতি

২০২৫ সালে এই গবেষণা আরও এক ধাপ এগিয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের ‘অ্যাল্পায়েড ফিজিক্স ল্যাব’ একটি ফিজিক্যাল ওয়ার্প ড্রাইভের মডেল প্রদর্শন করে। তাদের গবেষণায় দেখা যায়, স্পেসটাইমকে ভাঁজ করতে এখন আর কাল্পনিক নেগেটিভ এনার্জির প্রয়োজন নেই। বরং পরিচিত ধনাত্মক শক্তি এবং সাধারণ আপেক্ষিকতার নিয়ম মেনেই এর সমাধান সম্ভব।

তারা এমন একটি ওয়ার্প বাবলের নকশা প্রকাশ করেছে, যা আলোর গতির চেয়ে কম (সাব-লুমিনাল) হলেও বাস্তবে নির্মাণযোগ্য। এর অর্থ হলো, ওয়ার্প ড্রাইভ এখন আর কেবল কল্পবিজ্ঞানের বিষয় নয়, এটি ধীরে ধীরে বাস্তব বৈজ্ঞানিক আলোচনার অংশ হয়ে উঠছে।

ভবিষ্যতের সম্ভাবনা

সহজ কথায়, বিজ্ঞান এখন আর জোর দিয়ে বলছে না যে “ওয়ার্প ড্রাইভ অসম্ভব”। বরং ধারণাটি অতীতের তুলনায় অনেক বেশি বাস্তবসম্মত হয়ে উঠেছে। যদিও প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ এবং শক্তির চাহিদা এখনও বিশাল, কিন্তু প্রথমবারের মতো এর একটি গাণিতিক কাঠামো “ফিজিক্যালি” বা পদার্থবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বাস্তবসম্মত বলে বিবেচিত হচ্ছে।

ইতিহাস আমাদের শেখায়, মানুষ যা কল্পনা করতে পারে, তা বাস্তবায়নের পথ একদিন না একদিন খুঁজে বের করে। আজকের বিজ্ঞান কল্পকাহিনীই আগামী দিনের বিজ্ঞান। তাই স্টার ট্রেকের সেই ওয়ার্প ড্রাইভ হয়তো ভবিষ্যতের বিজ্ঞানীদের হাত ধরে একদিন সত্যিই আমাদের নক্ষত্র জয়ের স্বপ্ন পূরণ করবে।

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular