Thursday, January 15, 2026

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ওয়েব সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।  আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeপদার্থ বিজ্ঞানএক্স-রে আবিষ্কার: উইলহেল্ম রনটগেনের যুগান্তকারী ইতিহাস

এক্স-রে আবিষ্কার: উইলহেল্ম রনটগেনের যুগান্তকারী ইতিহাস

১৮৯৫ সালের নভেম্বর মাসের ৮ তারিখ। কনকনে শীতের রাত। জার্মানির ভুরৎসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে ল্যাবরেটরির অন্ধকার কোণে একা বসে গবেষণা করছেন পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক উইলহেল্ম কনরাড রনটগেন। তাঁর সামনে টেবিলে রাখা ছিল “লেনার্ড টিউব”। যার ভেতর দিয়ে ছুটে চলেছে ক্যাথোড রে, অর্থাৎ ঋণাত্মক চার্জযুক্ত কণার ধারা।

টিউবটি কালো কাগজে খুব ভালোভাবে মোড়ানো ছিল, যাতে সামান্য আলোও বাইরে বেরোতে না পারে। সবকিছুই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু হঠাৎ তাঁর চোখে ধরা পড়ল আশ্চর্য এক দৃশ্য, যা পরবর্তীতে এক্স-রে আবিষ্কার-এর পথ তৈরি করে।

গবেষণাগারে এক অদ্ভূত ঘটনা

টেবিলের পাশে রাখা ছিল বেরিয়াম প্লাটিনোসায়ানাইডে মোড়া একটি ফ্লূরোসেন্ট পর্দা। হঠাৎ করে সেই পর্দাটি আলো ঝলমল করে উঠল। দেখে মনে হলো, যেন অদৃশ্য কোনো আলো তার ভেতরে প্রাণ জাগিয়ে তুলেছে। কিন্তু এটা তো হওয়ার কথা নয়, কারণ টিউবের আলো কালো কাগজে ঢেকে রাখা হয়েছে। তবুও সেই অদৃশ্য আলো ল্যাবরেটরির অন্ধকারে অদ্ভুত এক আবেশ ছড়িয়ে দিল।

রনটগেন অবাক হয়ে ফ্লূরোসেন্ট পর্দাটিকে একটু দূরে সরালেন, তবু সেটি আলো ছড়াচ্ছিল। তিনি আরও দূরে, প্রায় দুই মিটার পর্যন্ত পর্দাটি রাখলেন, কিন্তু তবুও সেই আলো জ্বলজ্বল করতে থাকল। তখনই তিনি বুঝলেন, এখানে এমন এক অদ্ভুত বিকিরণ ঘটছে, যা সাধারণ চোখে দেখা যায় না, কিন্তু তা পদার্থ ভেদ করে অনেক দূরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

বার্থার হাত ও প্রথম এক্স-রে ছবি

এরপর শুরু হলো তাঁর নিরলস পরীক্ষা-নিরীক্ষা। তিনি একে একে নানা বস্তু সেই অজানা রশ্মির সামনে রাখলেন। কাগজ, কাঠ, ধাতু—সবই পরীক্ষা করা হলো এবং প্রতিটি পদার্থ আলাদা প্রতিক্রিয়া দেখাল।

অবশেষে একদিন তিনি এক ঐতিহাসিক পরীক্ষা করলেন। তিনি তাঁর স্ত্রী বার্থার হাতকে ফটোগ্রাফিক প্লেটের সামনে রাখলেন এবং হাতের ওপর সেই অজানা রশ্মির বিকিরণ ফেললেন। তারপর প্লেটটি ধোয়ার পর দেখা গেল এক বিস্ময়কর দৃশ্য। বার্থার হাতের হাড়গুলো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে এবং আঙুলে থাকা বিয়ের আংটিও ঝকমক করছে। কিন্তু হাতের চামড়া বা মাংসের কোনো অস্তিত্ব ছবিতে নেই। মানুষের শরীরের ভেতরের হাড়ের কাঠামো এভাবেই প্রথমবারের মতো ছবিতে ধরা পড়ল।

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিপ্লব

রনটগেন এই রহস্যময় আলোকরশ্মির নাম দিলেন ‘এক্স-রে’, অর্থাৎ অজানা রশ্মি। তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করে প্রমাণ করলেন যে, এই রশ্মি ধাতু ছাড়া প্রায় সবকিছুই ভেদ করতে পারে। ১৮৯৫ সালের শেষদিকে তিনি তাঁর গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করেন। মুহূর্তেই গোটা বিজ্ঞানজগৎ বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে যায়।

এরপর চিকিৎসাবিজ্ঞানে শুরু হলো এক নতুন যুগ। এক্স-রে আবিষ্কার-এর ফলে শরীর কাটা-ছেঁড়া ছাড়াই দেহের ভেতর দেখা সম্ভব হলো। এর মাধ্যমে সহজেই শনাক্ত করা গেল:

  • ভাঙা হাড়ের অবস্থান।

  • ফুসফুসের জটিলতা বা ছায়া।

  • শরীরের ভেতরের নানা গোপন ব্যাধি।

স্বীকৃতি ও আজকের রেডিওগ্রাফি

মানবকল্যাণে এই আবিষ্কারের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। এর স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯০১ সালে উইলহেল্ম রনটগেন পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে প্রথম নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন।

তাঁর সেই যুগান্তকারী আবিষ্কার আজও বেঁচে আছে প্রতিটি হাসপাতালের রেডিওলজি কক্ষে এবং প্রতিদিন অসংখ্য প্রাণ বাঁচাচ্ছে। এই আবিষ্কারকে সম্মান জানিয়ে প্রতি বছর ৮ নভেম্বর পৃথিবীজুড়ে পালিত হয় “ওয়ার্ল্ড রেডিওগ্রাফি ডে”। এই দিনটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, একজন বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের অসামান্য কৌতূহল ও অধ্যবসায় কতটা শক্তিশালী হতে পারে।

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular