Thursday, January 15, 2026

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ওয়েব সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।  আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeপ্রকৃতি ও পরিবেশপৃথিবীর ভৌগোলিক ও চৌম্বকীয় মেরু ব্যাখ্যা

পৃথিবীর ভৌগোলিক ও চৌম্বকীয় মেরু ব্যাখ্যা

সূর্যের কক্ষপথে পৃথিবী তার নিজের অক্ষের উপর প্রতিনিয়তই পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে ঘুরছে। নিজ অক্ষের উপর পুরো একবার ঘুরে আসতে পৃথিবীর সময় লাগে ২৩ ঘণ্টা, ৫৬ মিনিট, ৪ সেকেন্ড। পৃথিবীর এই লাটিমের মত ঘোরার ফলেই প্রতিদিন ‌পূর্ব দিকে সূর্যের উদয় হচ্ছে এবং পশ্চিম দিকে সূর্য অস্ত যাচ্ছে। অর্থাৎ এই গতির ফলেই পৃথিবীতে দিন-রাত্রি হয়। এটাকে বলে পৃথিবীর আহ্নিক গতি।
পৃথিবীর ঘূর্ণন অক্ষরেখা উত্তর এবং দক্ষিণ বরাবর পৃথিবীর পৃষ্ঠতলের সাথে দু’টো বিন্দুতে এসে মিলিত হয়েছে। এই দু’টো ভৌগোলিক বিন্দুকে বলা হয়, উত্তর মেরু এবং দক্ষিণ মেরু। বাংলায় এদের সুমেরু এবং কুমেরুও বলে। ভৌগলিক উত্তর মেরু হলো পৃথিবীর উত্তরতম বিন্দু, ৯০ ডিগ্রী উত্তর অক্ষাংশে এর অবস্থান। উত্তর গোলার্ধের সব দ্রাঘিমাংশ এখানে এসে মিলিত হয়েছে। পৃথিবীতে এর উত্তরে আর কিছু নেই। উত্তর মেরু বিন্দুতে দাঁড়ালে সব দিকই দক্ষিণ দিক নির্দেশ করে।
অন্যদিকে ভৌগলিক দক্ষিণ মেরু হলো পৃথিবীর দক্ষিণতম বিন্দু, ৯০ ডিগ্রী দক্ষিণ অক্ষাংশে এর অবস্থান। এর দক্ষিণে আর কিছু নেই। দক্ষিণ গোলার্ধের সব দ্রাঘিমাংশ এখানে এসে মিলিত হয়েছে। দক্ষিণ মেরু বিন্দুতে দাঁড়ালে সব দিকই উত্তর দিক নির্দেশ করে।
ভৌগলিক উত্তর মেরুর অবস্থান গ্রীনল্যান্ডের উত্তরে, আর্কটিক মহাসাগরের মাঝামাঝি। এখানে সমুদ্রের গভীরতা চার কিলোমিটারের কিছুটা বেশি। বছরের বেশিরভাগ সময় এই অঞ্চল সমুদ্রে ভাসমান বরফ খণ্ডে ঢাকা থাকে। সেজন্য ভৌগলিক উত্তর মেরুতে স্থায়ীভাবে কোনো পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা দুরূহ। এখানকার গড় তাপমাত্রা গ্রীষ্মকালে থাকে ০ ডিগ্রী এবং শীতকালে থাকে মাইনাস ৪০ ডিগ্রী সেলসিয়াস।
অন্যদিকে ভৌগোলিক দক্ষিণ মেরুর অবস্থান অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের মাঝামাঝি একটি দুর্গম জায়গায়। এই স্থানটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৮৩৫ মিটার উঁচুতে অবস্থিত। ১৯৫৬ সাল থেকে এখানে একটি স্থায়ী পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে। এর নাম হলো আমুন্ডসেন-স্কট সাউথ পোল স্টেশন। এই স্টেশনে সারা বছরই বিজ্ঞানীরা দক্ষিণ মেরুকে ঘিরে বিভিন্ন ধরনের পর্যবেক্ষণ এবং পরীক্ষা করে থাকেন। এখানকার গড় তাপমাত্রা গ্রীষ্মকালে থাকে মাইনাস ২৮ ডিগ্রী এবং শীতকালে থাকে মাইনাস ৬০ ডিগ্রী সেলসিয়াস।
বলাই বাহুল্য, দক্ষিণ মেরু উত্তর মেরুর চেয়ে অনেক বেশি শীতল স্থান। ভৌগলিক অবস্থানের কারণে দুই মেরুতেই শীতকাল এবং গ্রীষ্মকাল ছাড়া আর অন্য কোনো ঋতু নেই। শীতকালে মেরু অঞ্চলে সূর্যের দেখা মেলে না। গ্রীষ্মকালে ঠিক এর উল্টোটা হয়, তখন মেরু অঞ্চলে সূর্য অস্ত যায় না। তবে মেরু অঞ্চলে সূর্য দিগন্তরেখার খুব বেশি উপরে উঠে না। উত্তর মেরুতে যখন শীতকাল হয়, দক্ষিণ মেরুতে তখন থাকে গ্রীষ্মকাল। নিজ কক্ষপথে পৃথিবী কিছুটা হেলে থাকার কারণে দুই বিপরীত মেরুতে একই সময়ে সূর্যের দেখা মেলে না। পৃথিবীর ভৌগোলিক উত্তর এবং দক্ষিণ মেরুর মধ্যকার দূরত্ব হলো ২০,০০৪ কিলোমিটার।
ভৌগোলিক উত্তর এবং দক্ষিণ মেরু ছাড়াও পৃথিবীর আরো দু’টো মেরু রয়েছে। এ দু’টো হলো পৃথিবীর চৌম্বকীয় মেরু বা ম্যাগনেটিক পোল। পৃথিবীর অভ্যন্তরে গলিত লোহার প্রবাহ থেকে এক ধরনের শক্তিশালী চৌম্বকীয় ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়। এই চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের প্রভাবেই কম্পাসের কাঁটা নড়ে ওঠে এবং দিক নির্দেশ করে। কম্পাসের কাঁটা একটি চুম্বক। চুম্বকের কাঁটার দক্ষিণ মেরু পৃথিবীর চৌম্বকীয় উত্তর মেরুর দিকে ফিরে থাকে, কারণ দুটি চুম্বকের বিপরীত মেরুতে আকর্ষণ এবং সম মেরুতে বিকর্ষণ ঘটে।
উত্তর ও দক্ষিণ চৌম্বকীয় মেরুর অবস্থান ভৌগোলিক উত্তর এবং দক্ষিণ মেরু থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এদের মাঝে যথেষ্ট দূরত্ব রয়েছে। বর্তমানে উত্তর চৌম্বকীয় মেরুর অবস্থান ভৌগোলিক উত্তর মেরু থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দক্ষিণ দিকে। অন্যদিকে দক্ষিণ চৌম্বকীয় মেরুর অবস্থান ভৌগলিক দক্ষিণ মেরু থেকে ২৮৬০ কিলোমিটার উত্তরে।
সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো, পৃথিবীর চৌম্বকীয় মেরু ভৌগোলিক মেরুর মতো এক জায়গায় স্থির থাকে না। পৃথিবীর অভ্যন্তরে গলিত লোহার পরিচলনের ফলে চৌম্বকীয় মেরুদ্বয় তাদের অবস্থান সর্বদা পরিবর্তন করে। বিজ্ঞানীদের ধারণা এখন থেকে প্রায় ৭ লক্ষ ৩০ হাজার বছর আগে পৃথিবীর চৌম্বকীয় মেরু দুটির অবস্থান ছিল বর্তমান অবস্থানের সম্পূর্ণ বিপরীতে। ভবিষ্যতেও পৃথিবীর চৌম্বকীয় মেরু আবার উল্টে যেতে পারে।
পৃথিবীর চৌম্বকীয় ক্ষেত্র মহাকাশে বেশ খানিকটা বিস্তৃত। তাই বলা যায়, আমাদের এই পৃথিবীটা মহাকাশে ভাসমান একটি শক্তিশালী চুম্বক। এই চৌম্বকীয় ক্ষেত্র পৃথিবীকে নানা ধরনের ক্ষতিকর মহাজাগতিক রশ্মির আঘাত থেকে প্রতিনিয়ত রক্ষা করে চলেছে। এই চৌম্বকীয় ক্ষেত্র না থাকলে পৃথিবী নামক গ্রহটি জীবজগতের জন্য বাসযোগ্য হতো না। ভবিষ্যতে পৃথিবীর চৌম্বকীয় মেরুদ্বয় কোনো কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা দুর্বল হয়ে পড়লে জীবজগতের উপর এর বিরূপ প্রভাব পড়বে।
Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular