সরলরেখা বনাম বক্ররেখা
ছোটবেলায় জ্যামিতির ক্লাসে শিখেছিলাম, দুটি বিন্দুর মাঝে ক্ষুদ্রতম দূরত্ব সব সময়ই একটি সরলরেখা। সেই পাঠ ভুল ছিল না। তবে সেটি কেবল সমতল বা ফ্ল্যাট জায়গার জন্যই প্রযোজ্য। পৃথিবীর মতো গোলাকার পৃষ্ঠে একই নিয়ম খাটে না।
দূরপাল্লার বিমান চলাচলের দিকেই তাকান। নিউইয়র্ক থেকে মস্কো, লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে লন্ডন, কিংবা দুবাই থেকে টরন্টো—কোথাওই বিমানগুলো কাগজে টানা সরলরেখা ধরে চলে না। মানচিত্রে বিমান চলাচলের যে পথটিকে বাঁকানো দেখায়, বাস্তবে সেটাই পৃথিবীর গোলাকৃতি পৃষ্ঠে সবচেয়ে ছোট পথ।
এটাকে বলা হয়, গ্রেট সার্কেল রুট। পাইলটরা সেই পথেই উড়ে যান কম সময়ে ও কম জ্বালানিতে গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য। মাঝে মাঝে তাঁরা উত্তর মেরুর ওপর দিয়েও উড়ে যান, কারণ সেখানে পৃথিবীর পৃষ্ঠ তাদের জন্য ক্ষুদ্রতর দূরত্বের এক নতুন রাস্তা খুলে দেয়।
ইউক্লিড থেকে বাস্তবতা
তাহলে কি আমাদের স্কুলের জ্যামিতি ভুল? মোটেও নয়। ইউক্লিড নামের মহান গ্রিক গণিতজ্ঞ দুই হাজার বছর আগে সমতল জ্যামিতির যে মৌলিক নিয়মগুলো দিয়েছিলেন, সেগুলো সমতলের জন্য একদম সঠিক।
কিন্তু পৃথিবী তো সমতল নয়। এটি মহাশূন্যে ভেসে থাকা একটি বিশাল গোলক, যার পৃষ্ঠ বাঁকা। স্বল্প দূরত্বে এই বক্রতা বোঝা না গেলেও দীর্ঘ দূরত্বে সেটা বড়ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। দূরপাল্লার বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে পাইলটরা তাই পৃথিবীর এই বক্রতাকে সবসময় হিসেবের মধ্যে রাখেন।
জিওডেসিক: বক্রপৃষ্ঠের সরলরেখা
একটি বক্রপৃষ্ঠে দুটি বিন্দুর মধ্যে সর্বনিম্ন দূরত্বকে বলা হয়, জিওডেসিক।
- সমতলে জিওডেসিক একটি সরলরেখা।
- পৃথিবীর মতো বাঁকানো পৃষ্ঠে জিওডেসিক হয়ে উঠে একটি বক্ররেখা।
এই বক্ররেখার সঠিক হিসেব মেলানোর জন্য দরকার এক বিশেষ জ্যামিতি, এর নাম রীম্যানের জ্যামিতি। ঊনবিংশ শতাব্দীতে জার্মান গণিতজ্ঞ বার্নহার্ড রীম্যান বক্রপৃষ্ঠের জন্য একটি গভীর গাণিতিক কাঠামো তৈরি করেছিলেন। যার নাম, মেট্রিক টেনসর।
কোন স্থানের জ্যামিতি কতটা বাঁকা, সেই বক্রতার পরিমাণ কীভাবে পরিবর্তিত হয়, এসব কিছুর হিসেব এই মেট্রিক টেনসর দিয়েই করা যায়। মেট্রিক টেনসর বদলে গেলে স্থানের জ্যামিতিও বদলে যায়।
আইনস্টাইন ও মহাকর্ষের জ্যামিতি
রীম্যানের এই ধারণাই পরে আইনস্টাইনের হাতে নতুন মহিমা পায়। আইনস্টাইন সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্বে দেখালেন, মহাকর্ষ কোনো রহস্যময় দূরবর্তী আকর্ষণ নয়। মহাকর্ষ মূলত চার-মাত্রিক স্থান-কালের বক্রতার বহিঃপ্রকাশ। এটি একটি জ্যামিতিক ব্যাপার।
কোন বস্তুর ভর যত বেশি হয়, তার চারপাশের স্থান-কাল তত বেশি বাঁকে। আর এই বক্রতাকে বর্ণনা করার জন্য তিনি রীম্যানের মেট্রিক টেনসরকে কাজে লাগিয়েছিলেন। মহাবিশ্বের গঠন, নক্ষত্রের গতিপথ, ব্ল্যাকহোলের জন্ম—সবকিছুই এই বক্রতার সমীকরণ মেনে চলে।
অদ্ভুত ত্রিভুজ: তিন কোণের সমষ্টি ২৭০ ডিগ্রি!
বক্রতার আরেকটি মজার উদাহরণ ধরা যাক। আমরা ছোটবেলায় শিখেছি, যে কোনো ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি ১৮০ ডিগ্রি। সেটাও ঠিক, কিন্তু কেবল সমতল পৃষ্ঠে। পৃথিবীর বক্র পৃষ্ঠে একটি বিশাল ত্রিভুজ কল্পনা করুন: ১. এর একটি বাহু হলো বিষুবরেখার ওপর। ২. অন্য দুটি বাহু হলো শূন্য ডিগ্রি ও ৯০ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশ।
প্রসঙ্গত বলে রাখি, ৯০ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশ রেখা বাংলাদেশের ভাঙ্গার উপর দিয়ে অতিক্রম করেছে, আর শুন্য ডিগ্রি দ্রাঘিমাংশ রেখা গেছে লন্ডনের গ্রিনিচের উপর দিয়ে। এই তিনটি রেখা কিন্তু পরস্পরকে সমকোণে ছেদ করে। ফলে ত্রিভুজটির তিন কোণই ৯০ ডিগ্রি। মোট যোগফল ২৭০ ডিগ্রি! এটা সমতলে অসম্ভব, কিন্তু পৃথিবীর বাঁকানো পৃষ্ঠে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।
কোথাও কোথাও আবার ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি ১৮০ ডিগ্রীর চেয়েও কম হতে পারে। সবকিছুই নির্ভর করে পৃষ্ঠের বক্রতার ওপর।
উপসংহার
এই বক্রতার সূক্ষ্ম গাণিতিক ব্যাখ্যা যখনই দরকার হয়েছে, বিজ্ঞানীরা ফিরে গেছেন রীম্যানের সেই জ্যামিতির কাছে। পৃথিবী থেকে মহাকাশের নক্ষত্র, যেখানেই পৃষ্ঠের বক্রতার কথা এসেছে, রীম্যানের জ্যামিতিই সেখানে আলো দেখিয়েছে।
তাঁর জ্যামিতি আমাদের শেখায়, বাস্তব জগত সবসময় সরলরেখার মতো সোজা নয়; কখনো কখনো সত্যের পথ বাঁকা হয়, আর সেই বক্রতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে মহাবিশ্বের গভীর গাণিতিক সৌন্দর্য।
