Sunday, March 1, 2026

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ওয়েব সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।  আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeজীবনের বিজ্ঞানফ্রাঙ্কলিন বার্লি: কৃষি বিপণনে আইনি লড়াই ও পিবিআর

ফ্রাঙ্কলিন বার্লি: কৃষি বিপণনে আইনি লড়াই ও পিবিআর

উন্নত জাত ও আইনি লড়াইয়ের শুরু

অস্ট্রেলিয়ার কৃষি বিপণনের ইতিহাসে “ফ্রাঙ্কলিন” বার্লি কেবল একটি শস্যের উন্নত জাত নয়, বরং এটি ছিল যুগান্তকারী এক আইনি লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দু। ১৯৮১ সালে তাসমানিয়ার এক সরকারি গবেষণা কেন্দ্রে “শ্যানন” আর “ট্রায়াম্ফ” নামের দুটো বার্লির জাতকে সংকরায়ণ করে তৈরি করা হয় এই নতুন জাতটি।

“ফ্রাঙ্কলিন” বার্লি খুব দ্রুতই কৃষকদের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এর দানা ঝকঝকে সুন্দর, ফলন ভালো, আর গুণগত মান ছিল অনন্য। তাসমানিয়ার প্রাদেশিক সরকার এর সম্ভাবনা বুঝতে পেরে কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্ভিদ প্রজনন অধিকার বা প্ল্যান্ট ব্রিডার্স রাইটস (PBR) আইনের আওতায় এর আইনি সুরক্ষা নিয়েছিল। এর অর্থ হলো, এই বার্লি ব্যবহার বা বাজারজাত করার অনুমতি কেবল তাসমানিয়া সরকার এবং তার লাইসেন্সধারী এজেন্টের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

বাণিজ্যিক দ্বন্দ্ব: তাসমানিয়া বনাম গ্রেইন পুল

কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার কৃষি বিপণন ব্যবস্থা এত সরল রৈখিক নয়, বিশেষত যেখানে বিপুল পরিমাণ শস্য বিদেশে রপ্তানি করা হয়। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার বিশাল শস্য বিপণন সংস্থা, “গ্রেইন পুল”, সরাসরি বাজার থেকে ফ্রাঙ্কলিন বার্লি কিনে নিয়ে বিদেশে রপ্তানি শুরু করলো।

তাদের যুক্তি ছিল—যখন কোনো শস্যের বীজ বাজারে বিক্রি হয়ে গেছে, তখন সেটি সাধারণ কৃষিপণ্য। সেখান থেকে ফসল ফলানো বা বিক্রির অধিকার থেকে আর কাউকে আটকে রাখা যায় না। অন্যদিকে তাসমানিয়া সরকার ও তাদের লাইসেন্সধারী কোম্পানি কালটিভস্ট দাবি করল, এই বার্লি ভ্যারাইটিটি দীর্ঘ গবেষণার ফসল, তাই তাদের অনুমতি ছাড়া এর বাণিজ্যিক ব্যবহার আইনসিদ্ধ নয়।

হাইকোর্টে সাংবিধানিক প্রশ্ন

বাণিজ্যিক দ্বন্দ্ব চরমে উঠলে বিষয়টি দেশের সর্বোচ্চ আদালত হাইকোর্টে পৌঁছায়। আদালতের কাছে মূল প্রশ্ন ছিল:

  • অস্ট্রেলিয়ার সংবিধানের ৫১(১৮) ধারায় “পেটেন্ট অব ইনভেনশন” বা আবিষ্কারের পেটেন্ট দেওয়ার ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের আছে।
  • কিন্তু নতুন উদ্ভিদের জাতকে কি সেই ধরনের “আবিষ্কার” বলা যায়?
  • অর্থাৎ, অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের তৈরি করা পিবিআর আইন কি আদৌ বৈধ?

হাইকোর্টের ফুল বেঞ্চে দীর্ঘ শুনানির পর সিদ্ধান্ত হলো—হ্যাঁ, নতুন উদ্ভিদের জাতও অস্ট্রেলিয়ার সংবিধানের উদ্ভাবনের সংজ্ঞার মধ্যেই পড়ে। ২০০০ সালে দেয়া এক রায়ে হাইকোর্ট স্পষ্ট জানিয়ে দিল, “ফ্রাঙ্কলিন” বার্লির মতো নতুন জাতের উপর প্রজনন অধিকার আইন সম্পূর্ণ বৈধ। এই রায় কৃষি ও সংবিধানের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত ছিল।

ফেডারেল কোর্টের মোড় ও পিবিআর সীমাবদ্ধতা

তবে হাইকোর্ট এটাও জানিয়ে দিয়েছিল, পিবিআর পেটেন্টের মতোই এক ধরনের মেধাসত্ব বা এক্সক্লুসিভ রাইট। এর অধিকারী চাইলে অন্যকে থামাতে পারবেন, কিন্তু ফসল নিজে বাজারজাত করার ক্ষেত্রে তার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

এই ঐতিহাসিক রায়ের পর, ২০০৪ সালে ফেডারেল কোর্টে এই লড়াই আরেক নতুন মোড় নিল। সেখানে বলা হলো, একবার ফসলের বীজ বাজারে বিক্রি হয়ে গেলে, উদ্ভিদ প্রজনন অধিকার বা পিবিআর কার্যত শেষ হয়ে যায়। কারণ:

  • এই অধিকারটি মূলত বীজের উপর, উৎপাদিত ফসলের উপর নয়।
  • তাই কৃষক বৈধভাবে বীজ কিনলে, সেই শস্য বিক্রি করতে গেলে ব্রিডার আর রয়্যালটি দাবি করতে পারেন না।

নতুন সমাধান: এন্ড পয়েন্ট রয়্যালটি (EPR)

এই আইনি টানাপোড়েন থেকেই কৃষি অর্থনীতিতে জন্ম নিল এক অভিনব সমাধান, যার নাম এন্ড পয়েন্ট রয়্যালটি বা EPR। এটি এক ধরনের চুক্তিভিত্তিক বীজ বিপণন ব্যবস্থা।

বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার একজন কৃষক যখন পিবিআর সুরক্ষিত জাতের বীজ কেনেন, তখন তিনি একটি EPR চুক্তি মেনে নেন। সেই চুক্তি অনুযায়ী:

  • ফসল বিক্রির সময় প্রতি টন শস্য থেকে একটি নির্দিষ্ট হারে রয়্যালটি সরাসরি ব্রিডারের কাছে চলে আসে।
  • এর ফলে বীজের সুরক্ষা এবং ফসলের আয়—দুটোই নিশ্চিত হলো।

উপসংহার

“ফ্রাঙ্কলিন” বার্লি নিয়ে এই দীর্ঘ আইনি লড়াই কৃষক, বিজ্ঞানী, বাজার ব্যবস্থাপক এবং নীতি-নির্ধারকদের এক মঞ্চে দাঁড় করিয়েছিল। আমি নিজেও তখন পরীক্ষক হিসেবে পিবিআর অফিসের সঙ্গে যুক্ত থেকে এই আলোড়ন কাছ থেকে দেখেছি।

এই মামলা শুধু একটি বার্লির জাতের ভাগ্য নির্ধারণ করেনি, বরং গোটা অস্ট্রেলিয়ার কৃষি বাণিজ্যের জন্য একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। এটি শিখিয়েছিল, জৈব প্রকৃতিকে বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনের মাধ্যমে রূপান্তরিত করা হলে সেই শ্রমকে আইন কতটা সম্মান জানাবে এবং কীভাবে উদ্ভাবনের মর্যাদা ও কৃষকের স্বার্থের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে হবে।

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

Most Popular