Wednesday, January 14, 2026

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ওয়েব সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।  আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeমহাকাশ বিজ্ঞানফার্মি প্যারাডক্স: এলিয়েনরা কোথায় ও মহাবিশ্বের নীরবতা

ফার্মি প্যারাডক্স: এলিয়েনরা কোথায় ও মহাবিশ্বের নীরবতা

ফার্মির সেই বিখ্যাত প্রশ্ন

নোবেল বিজয়ী ইতালিয়ান-আমেরিকান পদার্থবিজ্ঞানী এনরিকো ফার্মি একবার কথাচ্ছলে তাঁর বিজ্ঞানী বন্ধুদের কাছে একটি হেঁয়ালি প্রশ্ন করেছিলেন, “Where is everybody?” তারা সবাই কোথায়?

সালটা ছিল ১৯৫০। মানুষ তখন সবেমাত্র পরমাণু শক্তিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে লাগাতে শিখেছে। প্রথম কার্যকর পারমাণবিক চুল্লি তৈরি হয়েছিল ফার্মিরই নেতৃত্বে। পদার্থবিজ্ঞানে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁর নামেই প্রাথমিক বস্তুকণার এক শ্রেণির নামকরণ হয়েছে, ফার্মিয়ন। ফার্মি ছিলেন সে সময়ের প্রথম সারির বিজ্ঞানীদের একজন, আর মহাকাশ নিয়ে তাঁর কৌতূহল ছিল সীমাহীন।

মহাবিশ্বের নীরবতা ও প্যারাডক্সের জন্ম

এই প্রশ্নের ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক গভীর বিস্ময়। এই বিশাল মহাবিশ্বে অসংখ্য উন্নত এলিয়েন সভ্যতার অস্তিত্ব থাকা পরিসংখ্যানের দিক থেকে একেবারেই স্বাভাবিক। সেই সব সভ্যতার কাছে মহাশূন্যে ভ্রমণ কিংবা দূরপাল্লার যোগাযোগের জন্য উন্নত প্রযুক্তি থাকাটাও অস্বাভাবিক কিছু নয়।

অথচ আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, এতদিনেও আমরা তাদের কারো দেখা পাইনি। তারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের কোনো চেষ্টাই করেনি। তাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে আমরা নিশ্চিত নই, তারা কোথায় থাকে তা জানি না। এই বিস্ময়কর অসামঞ্জস্যটাই ছিল ফার্মির প্রশ্নের মূল কথা। পরবর্তীতে এই প্রশ্নটিই বিজ্ঞানী মহলে ফার্মি প্যারাডক্স নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।

সম্ভাব্য ব্যাখ্যা ও বিজ্ঞানীদের অনুমান

ফার্মি প্যারাডক্সের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা নানা সম্ভাবনার কথা বলেছেন:

  • দূরত্ব: কেউ বলেন, মহাবিশ্বে ভ্রমণের প্রধান অন্তরায়ই হলো অপরিসীম দূরত্ব। এত বিশাল দূরত্ব পেরিয়ে এলিয়েনদের পক্ষে পৃথিবীতে আসা সম্ভব হয়নি।
  • প্রয়োজনহীনতা: কেউ মনে করেন, তারা পৃথিবীতে আসার কোনো প্রয়োজনই অনুভব করেনি।
  • প্রযুক্তির অভাব: আবার কারো মতে, উন্নত সভ্যতাগুলো এখনো আদিম পর্যায়েই রয়েছে, মহাকাশযাত্রার মতো প্রযুক্তি তাদের হাতে আসেনি।
  • লুকোচুরি: এমনও বলা হয়, হয়তো আদিম পৃথিবীতে তারা এসেছিল, কিন্তু বর্তমান পৃথিবীকে নানা কারণে এড়িয়ে চলছে।
  • একাকীত্ব: আর একটি চরম ধারণা হলো, মহাবিশ্বে পৃথিবী ছাড়া আর কোথাও উন্নত সভ্যতার অস্তিত্বই নেই।

পরিসংখ্যান ও ড্রেক সমীকরণ

কিন্তু এই শেষ ধারণাটি পরিসংখ্যানের বিচারে খুব একটা টেকে না। আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতেই অন্তত চারশ’ বিলিয়ন নক্ষত্র রয়েছে। মহাবিশ্বে এরকম গ্যালাক্সি রয়েছে কয়েক শ’ বিলিয়ন, এমনকি সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী সংখ্যা প্রায় দুই ট্রিলিয়ন পর্যন্ত হতে পারে। সেই হিসেবে মহাবিশ্বে মোট নক্ষত্রের সংখ্যা দাঁড়ায় ১০^২২ থেকে ১০^২৪ এর মধ্যে।

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি পাঁচটি নক্ষত্রের অন্তত একটিতে পৃথিবীর মতো আকারের গ্রহ থাকতে পারে। অর্থাৎ মহাবিশ্বে পৃথিবীর মতো গ্রহের সংখ্যা হাজার বিলিয়ন বিলিয়নেরও বেশি। ইতিমধ্যেই সৌরজগতের বাইরে সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি গ্রহ আবিষ্কৃত হয়েছে, যাদের বলা হয় এক্সোপ্ল্যানেট। ভবিষ্যতে এই সংখ্যা যে আরও বহুগুণে বাড়বে, তা বলাই বাহুল্য।

পৃথিবীতে যদি প্রাণের উন্মেষ হতে পারে, তাহলে মহাবিশ্বের অসংখ্য গ্রহে প্রাণের জন্ম হওয়াটাই স্বাভাবিক। না হওয়াটাই বরং অস্বাভাবিক। আর সেই প্রাণ থেকে উন্নত সভ্যতার বিকাশ ঘটার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এই যুক্তিকেই গাণিতিক রূপ দিয়েছিলেন বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফ্র্যাঙ্ক ড্রেক তাঁর প্রস্তাবিত ড্রেক সমীকরণে। এই সমীকরণ দেখায়, আমাদের গ্যালাক্সিতেই উন্নত সভ্যতার সংখ্যা শূন্য থেকে কয়েক মিলিয়নের মধ্যে যেকোনো সংখ্যা হতে পারে।

যদি সত্যিই বহু আগে কোথাও এমন কোনো সভ্যতার জন্ম হয়ে থাকে, তাহলে মহাবিশ্বের বয়সের তুলনায় অতি স্বল্প সময়ের মধ্যেই তারা নিজেদের গ্যালাক্সি জুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারত। সে ক্ষেত্রে এতদিনে পৃথিবীতে তাদের উপস্থিতির কোনো না কোনো চিহ্ন পাওয়া যেত। কিন্তু তেমন কিছুই আমরা পাইনি। এখানেই ফার্মির বিস্ময়।

মানবীয় দৃষ্টিভঙ্গি বনাম এলিয়েন মনস্তত্ত্ব

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে কেউ কেউ বলেন, হয়তো আমরা এলিয়েন সভ্যতাকে মানব সভ্যতার মাপকাঠিতে বিচার করছি। এমনও হতে পারে, তারা মানুষের মতো হিংস্র নয়, তারা কলোনাইজেশনে বিশ্বাস করে না। তারা হয়তো দূর থেকেই আমাদের পর্যবেক্ষণ করছে, কিন্তু হস্তক্ষেপ করতে চায় না।

আবার আরেক দল বিজ্ঞানীর মতে, উন্নত সভ্যতাগুলো প্রযুক্তির চরম শিখরে পৌঁছে নিজেদের ভেতরের দ্বন্দ্ব, যুদ্ধ কিংবা পরিবেশ ধ্বংসের মাধ্যমে নিজেরাই নিজেদের নিশ্চিহ্ন করে ফেলে। ফলে মহাবিশ্ব জয়ের আগেই তাদের ইতিহাস শেষ হয়ে যায়।

বেরেজিনের তত্ত্ব: আমরাই কি ধ্বংসকারী?

এই আলোচনায় সাম্প্রতিক সময়ে এক নতুন ও বেশ অস্বস্তিকর ধারণা যোগ করেছেন রাশিয়ান বংশোদ্ভূত পদার্থবিজ্ঞানী আলেকজান্ডার বেরেজিন। তাঁর মতে, মহাবিশ্বে উন্নত সভ্যতার অনুপস্থিতি কোনো রহস্যময় নীরবতার ফল নয়, বরং সভ্যতার স্বাভাবিক বিকাশেরই এক অনিবার্য পরিণতি। যে সভ্যতা প্রথম মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন করে, শেষ পর্যন্ত তারাই একমাত্র টিকে থাকে।

কারণ এই বিস্তার ইচ্ছাকৃত আগ্রাসনের ফল নাও হতে পারে। যেমন পৃথিবীতে মানুষের সভ্যতা শহর, রাস্তা আর শিল্প গড়তে গিয়ে নিজের অজান্তেই বনভূমি ও প্রাণীর আবাস ধ্বংস করেছে। কেউ পিঁপড়েকে শত্রু মনে করে রাস্তা বানায় না, তবু পিঁপড়ের বাসা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। বেরেজিনের মতে, উন্নত এলিয়েন সভ্যতার ক্ষেত্রেও এমনটাই ঘটেছে। তারা অন্য সভ্যতাকে খুঁজে বা ধ্বংস করতে যায়নি, কিন্তু নিজেদের বিস্তার ঘটাতে গিয়ে অনিচ্ছাকৃতভাবেই অন্য সব সম্ভাব্য সভ্যতাকে মুছে ফেলেছে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, আমরা এখনো টিকে আছি কারণ আমরা এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছাইনি। আমরা এখনো একটি স্থানীয়, প্রযুক্তিগতভাবে সীমাবদ্ধ সভ্যতা। কিন্তু ভবিষ্যতে যদি মানুষ সত্যিই অন্য গ্রহে ছড়িয়ে পড়ে, যদি আমরা মাল্টি-প্ল্যানেটারি স্পিসিসে পরিণত হই, তাহলে আমাদের হাত দিয়েই কি অন্য কোনো নবীন সভ্যতার অপমৃত্যু ঘটবে? এই প্রশ্ন ফার্মি প্যারাডক্স-কে কেবল এলিয়েনের সন্ধান নয়, মানব সভ্যতার নৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও এক গভীর প্রশ্নে পরিণত করে।

গ্রেট ফিল্টার: সামনে না পেছনে?

এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা—গ্রেট ফিল্টার। এই ধারণা অনুযায়ী, প্রাণের জন্ম থেকে শুরু করে উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতায় পৌঁছানোর পথে এমন কোনো এক বা একাধিক ধাপ রয়েছে, যেটা পার হওয়া অত্যন্ত কঠিন।

  • হতে পারে প্রাণের জন্মই বিরল।
  • হতে পারে বুদ্ধিমত্তার বিকাশ দুর্লভ।
  • আবার হতে পারে উন্নত সভ্যতা প্রযুক্তির চরম পর্যায়ে পৌঁছে নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনে।

ভয়ের বিষয় হলো, এই গ্রেট ফিল্টারটি হয়তো আমাদের পেছনে নয়, আমাদের সামনেই অপেক্ষা করছে।

উপসংহার ও মানুষের ভবিষ্যৎ

আসলে ফার্মি প্যারাডক্সের কোনো নিশ্চিত উত্তর আমাদের জানা নেই। সবই অনুমান, যুক্তি আর কল্পনার সমন্বয়। এলিয়েনরা কী করছে বা করছে না, সেটা আমরা জানি না। তবে একটি বিষয় আমরা নিশ্চিতভাবে জানি—এই সুজলা সুফলা সুন্দর গ্রহটিকে সভ্যতার নামে, উন্নয়নের নামে আমরা তিলে তিলে ধ্বংস করে চলেছি।

অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন, ভবিষ্যতে মানব সভ্যতাকে বাঁচাতে হলে অন্য গ্রহে গিয়ে মানুষের বসতি স্থাপন করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। মানুষ তখন ছড়িয়ে পড়বে মহাবিশ্বে। মানুষ হয়ে উঠবে বহু জাগতিক প্রাণী। তখন মানুষই কি হয়ে উঠবে অন্য গ্রহের এলিয়েন? এই প্রশ্নটাও এক গভীর প্যারাডক্স।

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular