কোষের গভীরে প্রাচীন ইতিহাস
আজকের পৃথিবীতে আমরা বিভিন্ন ধরনের জটিল, বহুকোষী জীবনের কথা জানি। কিন্তু আমরা কী জানি, এই সমস্ত জীবকোষের গভীরে লুকিয়ে আছে এক প্রাচীন সহাবস্থানের ইতিহাস? এই ইতিহাসের নাম, এন্ডোসিম্বায়োসিস (Endosymbiosis)।
শব্দটা শুনতে খটমটে মনে হলেও, ধারণাটা খুবই সরল। জীবজগতের সূচনালগ্নে কোনো একসময়ে এক কোষ আরেক কোষকে গিলে ফেলেছিল, কিন্তু ধ্বংস করেনি। বরং দুই কোষ মিলে একসাথে থাকার পথ বেছে নিয়েছিল। আর সেই যৌথ সিদ্ধান্তই বদলে দিয়েছে জীবনের ভবিষ্যৎ।
শক্তির উৎস: ব্যাকটেরিয়ার সহাবস্থান
প্রায় দুই বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীর জীবজগৎ ছিল অত্যন্ত সাধারণ। তখন পৃথিবীতে রাজত্ব করছিল বিভিন্ন প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া। এরা ছিল নিউক্লিয়াসবিহীন, এককোষী, সরল জীব। ঠিক সেই সময়েই ঘটে যায় যুগান্তকারী এক ঘটনা।
এক তুলনামূলক বড় ব্যাকটেরিয়া তার ভেতরে ঢুকিয়ে নেয় অন্য একটি শক্তি উৎপাদনকারী ছোট ব্যাকটেরিয়াকে। স্বাভাবিক নিয়মে তার হজম হয়ে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু সেটা হয়নি। বরং সেই ছোট ব্যাকটেরিয়াটি বড় ব্যাকটেরিয়ার কোষের ভেতর নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পায়, আর বিনিময়ে সেই কোষটিকে দেয় বিপুল পরিমাণ শক্তি। এই সহাবস্থানই ধীরে ধীরে রূপ নেয় আজকের জীবকোষের মাইটোকন্ড্রিয়াতে, যাকে আমরা আজ জানি কোষের “পাওয়ার হাউস” হিসেবে।
অকাট্য প্রমাণ: ডিএনএ ও জিনোম
এই বৈপ্লবিক ধারণার পেছনে সবচেয়ে শক্ত প্রমাণ আসে মাইটোকন্ড্রিয়ার নিজস্ব ডিএনএ থেকে। কোষের নিউক্লিয়াসের ডিএনএ যেমন সুতোর মতো লম্বা, মাইটোকন্ড্রিয়ার ডিএনএ ঠিক তেমন নয়। এটি বৃত্তাকার, একেবারে ব্যাকটেরিয়ার ডিএনএর মতো। শুধু আকারেই নয়, জিনের বিন্যাস ও জেনেটিক ভাষাও ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে আশ্চর্যরকমভাবে মিলে যায়।
আধুনিক জিনোম বিশ্লেষণ স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে, মাইটোকন্ড্রিয়ার ডিএনএর সবচেয়ে কাছের আত্মীয় হলো আলফা-প্রোটিওব্যাকটেরিয়া। এটা কোনো প্রতীকী মিল নয়, এটা সরাসরি বংশগত সম্পর্কের প্রমাণ।
ক্লোরোপ্লাস্ট ও উদ্ভিদের খাদ্য
ঠিক একই রকম ধারণা রয়েছে সবুজ উদ্ভিদ ও শৈবালের কোষে থাকা ক্লোরোপ্লাস্ট নিয়ে। কোনো একসময়ে সালোকসংশ্লেষী সায়ানোব্যাকটেরিয়া অন্য একটি কোষের ভেতরে আশ্রয় নিয়েছিল। সেই সহাবস্থানের ফলেই উদ্ভিদ কোষ সূর্যের আলো ব্যবহার করে নিজের খাবার নিজেই তৈরি করার ক্ষমতা অর্জন করে।
ক্লোরোপ্লাস্টের নিজস্ব ডিএনএ, তার বৃত্তাকার গঠন, এমনকি সালোকসংশ্লেষণে ব্যবহৃত রাসায়নিক পথ—এ সবই আজও সেই আদিম যুগের সায়ানোব্যাকটেরিয়ার স্মৃতি বহন করে।
রাইবোজোম ও অ্যান্টিবায়োটিক রহস্য
এন্ডোসিম্বায়োসিসের আরেকটি শক্ত প্রমাণ লুকিয়ে আছে রাইবোজোমে। ইউক্যারিওটিক কোষের সাধারণ রাইবোজোম আকারে বড়, কিন্তু মাইটোকন্ড্রিয়া ও ক্লোরোপ্লাস্টের ভেতরের রাইবোজোম ছোট, ঠিক ব্যাকটেরিয়ার মতো।
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, কিছু কিছু অ্যান্টিবায়োটিক যেগুলো ব্যাকটেরিয়ার প্রোটিন তৈরির প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয়, সেগুলো একইভাবে মাইটোকন্ড্রিয়ার ভেতরের প্রোটিন সংশ্লেষণও থামিয়ে দিতে পারে। অথচ কোষের অন্য অংশে সেই ওষুধের কোনো প্রভাব পড়ে না। এই আচরণ স্পষ্ট করে দেয়—জীবকোষের এই অঙ্গাণুগুলোর উৎস আলাদা।
কোষ বিভাজন ও মেমব্রেন গঠন
কোষ বিভাজন প্রক্রিয়াতেও এই প্রাচীন ইতিহাসের ছাপ স্পষ্ট। মাইটোকন্ড্রিয়া বা ক্লোরোপ্লাস্ট কখনো নিউক্লিয়াসের মতো মাইটোসিসে বিভাজিত হয় না। তারা ব্যাকটেরিয়ার মতোই বাইনারি ফিশন পদ্ধতিতে এক থেকে দুই হয়। এমনকি কোষের শক্তির চাহিদা বাড়লে মাইটোকন্ড্রিয়ার সংখ্যাও বেড়ে যায়। তারা যেন এখনও স্বাধীন জীবের মতো পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে।
এই প্রাচীন সহাবস্থানের গল্প সবচেয়ে সুন্দরভাবে ধরা পড়ে তাদের দ্বিস্তর বিশিষ্ট মেমব্রেনে:
- ভেতরের মেমব্রেনের গঠন ব্যাকটেরিয়ার মেমব্রেনের মতো।
- বাইরের মেমব্রেন ইউক্যারিওটিক কোষের মতো।
এই দ্বৈত কাঠামো যেন নীরবে বলে দেয়, একসময় এরা ছিল আলাদা সত্ত্বা, পরে একে অপরের ভেতরে বসবাস শুরু করেছে।
লিন মারগুলিস: এক সাহসী বিজ্ঞানীর গল্প
এন্ডোসিম্বায়োসিস তত্ত্বটি আজ এত শক্ত ভিত্তি পেয়েছে যে আধুনিক বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানে এটি প্রায় প্রশ্নাতীত। কিন্তু একসময় এটা ছিল বিতর্কিত। এই ধারণাকে বৈজ্ঞানিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসার সাহস দেখিয়েছিলেন একজন নারী জীববিজ্ঞানী, তাঁর নাম লিন মারগুলিস।
তিনি ছিলেন সেই বিরল বিজ্ঞানীদের একজন, যিনি মূলধারার বিজ্ঞান চিন্তাকে চ্যালেঞ্জ করার সাহস দেখিয়েছিলেন। ষাটের দশকে, যখন জীববিজ্ঞানে “প্রতিযোগিতা” আর “শক্তের টিকে থাকা” ছিল বিবর্তনের প্রধান ব্যাখ্যা, তখন মারগুলিস বলেছিলেন, জীবনের ইতিহাস আসলে সহযোগিতার গল্প।
তাঁর প্রস্তাবিত তত্ত্ব প্রথমে বহু নামকরা জার্নালই ছাপতে চায়নি; অনেক বিজ্ঞানী একে কল্পনাপ্রসূত বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি দমে যাননি। মাইক্রোস্কোপি, কোষতত্ত্ব আর পরবর্তীকালের জিনতাত্ত্বিক প্রমাণ একত্র করে দেখিয়েছিলেন, মাইটোকন্ড্রিয়া ও ক্লোরোপ্লাস্ট একসময় ছিল স্বাধীন ব্যাকটেরিয়া। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কথাই সত্য প্রমাণিত হয়।
উপসংহার
আজ এন্ডোসিম্বায়োসিস তত্ত্ব আধুনিক জীববিজ্ঞানের অন্যতম ভিত্তি। আর লিন মারগুলিস স্মরণীয় হয়ে আছেন সেই বিজ্ঞানী হিসেবে, যিনি আমাদের শিখিয়েছেন, বিবর্তনের চালিকাশক্তি কেবল লড়াই নয়, কখনো কখনো সহযোগিতাই টিকে থাকার সবচেয়ে শক্তিশালী কৌশল।
