Wednesday, January 14, 2026

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ওয়েব সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।  আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeমহাকাশ বিজ্ঞানআইনস্টাইনের ভুল: মহাকর্ষ তরঙ্গ ও ডার্ক এনার্জি রহস্য

আইনস্টাইনের ভুল: মহাকর্ষ তরঙ্গ ও ডার্ক এনার্জি রহস্য

মহাবিজ্ঞানী ও তাঁর যুগান্তকারী তত্ত্ব

আলবার্ট আইনস্টাইন ছিলেন একজন অসাধারণ প্রতিভাবান বিজ্ঞানী। অনেকের মতে তিনি ছিলেন সর্বকালের সর্বসেরা বিজ্ঞানী। গত শতাব্দীর গোড়ার দিকে, ১৯১৬ সালে তাঁর আবিষ্কৃত ‘জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি’ বা সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।

তিনি তাঁর তত্ত্বে স্থান, কাল এবং বস্তুকে (Space, Time and Matter) এক সম্পূর্ণ নুতন দৃষ্টিতে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বললেন, যদিও স্থান এবং কালকে আমরা আলাদা মনে করি, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মহাবিশ্বে স্থান এবং কাল একে অপরের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।

স্থান এবং কালের যৌথ বুননেই মহাবিশ্বের অবকাঠামো গঠিত হয়েছে। যখন কোনো বস্তু এর মধ্য দিয়ে ছুটে চলে, তখন স্থান-কালের বুননের মধ্যে এক ধরনের বক্রতার সৃষ্টি হয়। যে বস্তু যত বেশি ভারী, তার চারপাশে বক্রতার পরিমানও তত বেশি। এই বক্রতার মাঝে বস্তুর ছুটে চলায় স্থান-কালের চাদরে একধরনের কম্পনের সৃষ্টি হয়, যা তরঙ্গের আকারে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

মহাকর্ষ তরঙ্গ: শতাব্দীর অপেক্ষা

এটাকেই বিজ্ঞানীরা বলেন মহাকর্ষ তরঙ্গ বা গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ। যে বস্তু যত ভারী, তার মহাকর্ষ তরঙ্গও তত বেশি শক্তিশালী। কিন্তু তা সত্ত্বেও মহাকর্ষ তরঙ্গকে শনাক্ত করা সহজ নয়। কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটা খুবই ক্ষীণ এবং পৃথিবী থেকে শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন।

এক শতাব্দী পর সেই কঠিন কাজটিই করেছেন বর্তমান যুগের বিজ্ঞানীরা। ২০১৬ সালে একদল বিজ্ঞানীর একটি যুগান্তকারী আবিস্কার সারা পৃথিবীব্যাপী ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করেছিলো। সে বছর প্রথমবারের মত বিজ্ঞানীরা গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ বা মহাকর্ষ তরঙ্গের সন্ধান পেয়েছেন এক যুগান্তকারী পরীক্ষার মাধ্যমে।

এই পরীক্ষার সাথে জড়িত ছিলেন একহাজারেরও বেশি বিজ্ঞানী। এদের মধ্যে দুজন বাংলাদেশি বিজ্ঞানীও রয়েছেন। দুটো বিশাল আকৃতির ব্ল্যাকহোলের সংঘর্ষ থেকে উদ্ভুত মহাকর্ষ তরঙ্গের সন্ধান বিজ্ঞানীরা পেয়েছেন তাদের লেজার ইন্টারফেরোমিটারে (LIGO)। এই আবিস্কারটির জন্য মানুষকে অপেক্ষা করতে হয়েছে পুরো একটি শতাব্দী। আর সেই সাথে তাঁরা আবারো প্রমাণ করেছেন মহাবিজ্ঞানী আইনস্টাইনের তত্ত্বকে।

আইনস্টাইনের ‘সবচেয়ে বড়’ ভুল

তাহলে আইনস্টাইন ভুলটা করেছিলেন কোথায়? আসলে ব্যাপারটা হলো, আইনস্টাইন যখন তাঁর জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি প্রকাশ করেছিলেন, তখনও বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল মহাবিশ্ব চিরকাল স্থির অবস্থায় রয়েছে। মহাবিস্ফোরণ তত্ত্ব বা বিগ ব্যাং থিওরি তখনো আবিষ্কৃত হয়নি।

তৎকালীন সমসাময়িক মহাজাগতিক বিজ্ঞানের সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য আইনস্টাইনকে তাঁর ফিল্ড সমীকরণে একটি ধ্রুবকের আশ্রয় নিতে হয়েছিল। এর নাম তিনি দিয়েছিলেন ‘কসমোলোজিক্যাল কনস্ট্যান্ট’। গ্রিক অক্ষর ল্যামডা (Λ) দিয়ে এই কসমোলোজিক্যাল কনস্ট্যান্টকে তিনি চিহ্নিত করেছিলেন।

কিন্তু পরবর্তীকালে নানা পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত হলো মহাবিশ্ব মোটেই স্থির নয়, বরং এর পরিধি ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। তখন আইনস্টাইন তাঁর সমীকরণ থেকে কসমোলোজিক্যাল কনস্ট্যান্ট বা ল্যামডাকে বাদ দেন। তিনি তখন এটাও স্বীকার করেন যে, এটাই ছিল তাঁর বিজ্ঞানী জীবনের সবচেয়ে বড়ো ভুল। আইনস্টাইন মহাবিজ্ঞানী হলেও মানুষ ছিলেন। আর মানুষ মাত্রই ভুল করতে পারে।

ডার্ক এনার্জি ও ভুলের শুদ্ধিকরণ

কিন্তু আসলেই কি আইনস্টাইনের থিওরিতে কসমোলোজিক্যাল কনস্ট্যান্টকে অন্তর্ভুক্ত করাটা ভুল ছিল? নাকি পরে একে বাদ দেয়াটা ভুল ছিল—এ নিয়ে এখন বিজ্ঞানী মহলে প্রশ্ন উঠেছে। এর কারণ হলো বর্তমানে মহাবিশ্বে ‘ডার্ক এনার্জি’ নামে এক রহস্যময় অদৃশ্য শক্তির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।

ব্যাপারটি একটু খুলেই বলি। বিজ্ঞানীরা মনে করেন ১৩.৭ বিলিয়ন বছর আগে এক মহাবিস্ফোরণ বা বিগ ব্যাং-এর ফলে মহাবিশ্বের সূচনা হয়েছিল। এরপর থেকে মহাবিশ্ব ক্রমেই প্রসারিত হচ্ছে। নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত ধারণা করা হতো যে মহাবিশ্বের প্রসারণ এক সময় থেমে যাবে এবং মহাকর্ষের কারণে সংকুচিত হওয়া শুরু করবে মহাবিশ্ব।

কিন্তু নব্বইয়ের দশকে কিছু গবেষনা ও পর্যবেক্ষণের ফলে এটা এখন প্রমানিত হয়েছে যে, মহাবিশ্ব শুধু প্রসারিতই হচ্ছে না, বরং এর প্রসারণের গতি ক্রমশই বেড়ে যাচ্ছে। মহাবিশ্বের এই ত্বরান্বিত প্রসারণের ব্যাখ্যা দেওয়া খুবই কঠিন কাজ। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় কোনো এক অদৃশ্য শক্তি এর পেছনে কাজ করছে। এই অদৃশ্য শক্তিকেই বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন ডার্ক এনার্জি।

মহাবিশ্বের অদৃশ্য শক্তি ও উপসংহার

বিজ্ঞানীরা বলছেন মহাবিশ্বের শতকরা ৬৮ ভাগই হচ্ছে ডার্ক এনার্জি। মহাশূন্যের সর্বত্র এর সুষম অবস্থান। অন্যভাবে বলতে হয়, প্রকৃতপক্ষে এটি মহাশূন্যেরই একটি বৈশিষ্ট্য। মহাশূন্য আসলে শুন্য নয়, এর সর্বত্রই রয়েছে ডার্ক এনার্জি, যা ক্রমাগত গ্যালাক্সিগুলোকে দূর থেকে দুরে ঠেলে দিচ্ছে। এক কথায় মহাকর্ষের বিপরীতে কাজ করছে এই ডার্ক এনার্জি।

বছর দুয়েক আগে দুজন ফরাসি বিজ্ঞানীর একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে বিশ্বখ্যাত নেচার পত্রিকায়। তাঁরা মৌলিক গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন, আইনস্টাইনের সেই কসমোলজিক্যাল কনস্ট্যান্টের মাধ্যমেই ডার্ক এনার্জির সবচেয়ে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব।

বর্তমান যুগের বিজ্ঞানীরা তাই মনে করছেন, আইনস্টাইন তাঁর সমীকরণে প্রথমে কসমোলজিক্যাল কনস্ট্যান্টকে অন্তর্ভুক্ত করে আসলে আইনস্টাইনের ভুল করেননি, বরং অজান্তেই এক গভীর সত্যের ইঙ্গিত দিয়ে গিয়েছিলেন।

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular