মহাবিশ্বের প্রাচীন প্রতিচ্ছবি
এটি একটি আইনস্টাইন রিং-এর ছবি। আদিম মহাবিশ্বের একেবারে প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা বিস্ময়কর একটি দৃশ্য। সম্প্রতি জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণে প্রায় নিখুঁত এই রিং বা বলয় ধরা পড়েছে।
ছবিটির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অত্যন্ত দূরবর্তী একটি গ্যালাক্সি, যার নাম SPT0418-47। এটি পৃথিবী থেকে প্রায় ১২০০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। আমরা একে দেখছি এমন এক সময়ে, যখন মহাবিশ্বের বয়স ছিল মাত্র ১৮০ কোটি বছর। অর্থাৎ মহাবিশ্ব তখনো শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে পড়েনি।
আলোর বাঁক ও গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং
এই গ্যালাক্সি থেকে বেরিয়ে আসা আলো আমাদের কাছে সরাসরি পৌঁছায়নি। মাঝখানে থাকা এক বিশাল গ্যালাক্সির প্রবল মহাকর্ষ সেই আলোকে বাঁকিয়ে বড় করে দেখিয়েছে। যার ফলাফল একটি প্রায় সম্পূর্ণ বৃত্তাকার আলোকবলয়। যাকে বলা হয়, আইনস্টাইন রিং। এত নিখুঁত রিং মহাবিশ্বে খুব কমই দেখা যায়।
এখন প্রশ্ন হলো, এই রিং কীভাবে তৈরি হয়? আমাদের সামনে থাকা ভারী কোন গ্যালাক্সি আর অনেক দূরবর্তী কোন গ্যালাক্সি এক সরল রেখায় এলে, সামনের গ্যালাক্সির মহাকর্ষের প্রভাবে দূরের গ্যালাক্সির আলোর পথ বাঁকা হয়ে যায়। এই ঘটনাকেই বলা হয়, গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং।
প্রকৃতির অদৃশ্য ম্যাগনিফাইং গ্লাস
সংক্ষেপে বলা যায়, গ্র্যাভিটেশনাল লেন্স হলো প্রকৃতির এক অদৃশ্য ম্যাগনিফাইং লেন্স। এর প্রবল মহাকর্ষ বলের প্রভাবে জ্যোতির্বিদরা বহু ক্ষীণ ও দূরবর্তী গ্যালাক্সির সন্ধান পেয়েছেন।
মহাকর্ষের টানে আলো বেঁকে যাওয়ার এই বিস্ময়কর প্রক্রিয়াই আজ আমাদের চোখে খুলে দিচ্ছে মহাবিশ্বের গোপন দরজা। এই প্রাকৃতিক লেন্সের সাহায্যে মানুষ শুধু দূরতম গ্যালাক্সিকেই আবিষ্কার করছে না, পাশাপাশি উন্মোচন করছে মহাবিশ্বের অদৃশ্য কাঠামো আর রহস্যময় ডার্ক ম্যাটারের গোপন আভাস।
নামকরণ ও আইনস্টাইনের অবদান
এর মূল কৃতিত্ব হলো মহাবিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের, যার সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্বের ভিত্তিতেই গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের জন্ম হয়েছে। সেজন্যই গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের প্রভাবে কোন দূরবর্তী গ্যালাক্সির আলো বৃত্তের আকার ধারণ করলে তাকে বলা হয় “আইনস্টাইন রিং”।
জেমস ওয়েবের বিশ্লেষণ ও নতুন তথ্য
SPT0418-47 এর ক্ষেত্রে এই গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং এতটাই নিখুঁত যে, আলো একটি প্রায় পূর্ণ বৃত্ত বা আইনস্টাইন রিং তৈরি করেছে।
অবাক করার বিষয় হলো, জেমস ওয়েবের স্পেকট্রোস্কোপিক বিশ্লেষণে সেখানে কার্বন মনোক্সাইডের মতো অণুর অস্তিত্ব ধরা পড়েছে। এটা নতুন নক্ষত্র জন্মানোর স্পষ্ট ইঙ্গিত। তার মানে, মহাবিশ্বের এত প্রাচীন যুগেও এই আদিম গ্যালাক্সিতে আজকের আধুনিক গ্যালাক্সিগুলোর মতো দ্রুতগতিতে নক্ষত্র তৈরি হচ্ছিল।
