গমের গুরুত্ব ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
গম পৃথিবীর প্রধানতম খাদ্যশস্য। পাউরুটি, আটার রুটি, বিস্কুট, কেক, পরোটা, পাস্তা, নুডলস কিংবা পিৎজা—সবকিছুর মূল উপাদানই গম। হাজার হাজার বছর ধরে এই শস্য মানুষের সভ্যতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
বাংলাদেশেও গমের গুরুত্ব এখন দ্রুত বাড়ছে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে দেশের গমের চাহিদা ছিল মাত্র এক লক্ষ টন, আর এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৫ লক্ষ টনে। এর মধ্যে প্রায় ৬০ লক্ষ টন গম আমদানি করতে হয় বিদেশ থেকে। এই বিশাল আমদানি নির্ভরতা শুধু অর্থনৈতিক চাপই নয়, ভবিষ্যতের খাদ্যনিরাপত্তার জন্যও বড় উদ্বেগের বিষয়। তাই বাংলাদেশে এখন প্রয়োজন এমন আধুনিক প্রযুক্তি, যেটা উন্নত, রোগপ্রতিরোধী ও উচ্চ ফলনশীল গমের জাত দ্রুত তৈরি করতে পারে।
ডাবলড হ্যাপলয়েড প্রযুক্তি: এক বৈজ্ঞানিক বিপ্লব
ঠিক এমন সময়ে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্ল্যান্ট ব্রিডিং ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা হাতে নিয়েছেন এক যুগান্তকারী পদ্ধতি—ডাবলড হ্যাপলয়েড প্রযুক্তি (Doubled Haploid Technology)। এটি গমের জাত উন্নয়নের ধারাকে আমূল বদলে দিচ্ছে।
আর এই বিপ্লবের নেতৃত্বে আছেন বাংলাদেশেরই সন্তান, সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিন্সিপাল প্ল্যান্ট ব্রিডার, কৃষিবিদ ড. নিজাম আহমেদ। ২০০২ সালে তিনি ও তাঁর দল শুরু করেন এমন এক প্রয়াস, যেটা গমের নতুন জাত উদ্ভাবনের সময়কে অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে। সাধারণত একটি নতুন জাতের গম উদ্ভাবনে যেখানে লাগে ১০ থেকে ১২ বছর, সেখানে এই প্রযুক্তিতে সেটা সম্ভব মাত্র ছয় বছরে। শুনতে জাদুর মতো লাগলেও, এটি একটি নিখাদ বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া।
প্রযুক্তির কার্যপদ্ধতি ও সুবিধা
ডাবলড হ্যাপলয়েড প্রযুক্তিতে গমের কোষ থেকে প্রথমে তৈরি করা হয় এমন এক ‘হ্যাপলয়েড’ উদ্ভিদ, যার ক্রোমোজোম সংখ্যা স্বাভাবিক গমের অর্ধেক। পরে ল্যাবরেটরিতে সেটিকে দ্বিগুণ করে তৈরি করা হয় একেবারে স্থায়ী ও অভিন্ন জেনেটিক লাইন।
এর প্রধান সুবিধাগুলো হলো:
- সময় সাশ্রয়: জাত উদ্ভাবনের সময় প্রায় অর্ধেক কমে যায়।
- স্থিতিশীলতা: ফলাফল অনেক বেশি স্থিতিশীল এবং নির্ভুল হয়।
- দ্রুত চাষাবাদ: নতুন জাত খুব দ্রুত কৃষকের মাঠে পৌঁছে দেওয়া যায়।
এই পরিশুদ্ধ জেনেটিক লাইনই পরবর্তী প্রজন্মের উন্নত জাত তৈরির ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
বাণিজ্যিক সাফল্য ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
২০০৪ সালে এই প্রযুক্তির প্রথম বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু হয়। অস্ট্রেলিয়ার লংরিচ প্ল্যান্ট ব্রিডারস কোম্পানি ২০১০ সালে উদ্ভাবন করে প্রথম ডাবলড হ্যাপলয়েড নির্ভর জাত “স্পিটফায়ার (Spitfire)”। এরপর একে একে এসেছে প্রায় ২৫টি গমের জাত, যেগুলো আজ অস্ট্রেলিয়ার নানা অঞ্চলে সফলভাবে চাষ হচ্ছে।
সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রযুক্তি এখন অনেক দেশের কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ হিসেবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং আন্তর্জাতিক জার্নালেও এর বিস্তারিত প্রকাশিত হয়েছে। একসময় যেখানে বিজ্ঞানীরা নতুন গমের জাত তৈরি করতে এক দশকের বেশি সময় নিতেন, এখন কয়েক বছরের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে আশাব্যঞ্জক ফলাফল। তবুও গুণমানে কোনো আপস নেই; বরং আরও উন্নত, রোগপ্রতিরোধী, খরারোধী ও উচ্চফলনশীল জাত তৈরি হচ্ছে দ্রুততর গতিতে।
বাংলাদেশে প্রয়োগ ও সম্ভাবনা
বাংলাদেশের মতো দেশে এই প্রযুক্তি এক অনন্য সম্ভাবনা বয়ে আনতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে গমচাষ ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। এমন প্রেক্ষাপটে ডাবলড হ্যাপলয়েড প্রযুক্তি খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
যদি বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা কেন্দ্র (BWMRI) ও কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এই প্রযুক্তি গ্রহণ করে জাতীয় ব্রিডিং প্রোগ্রামে যুক্ত করে, তবে সুফল মিলবে দ্রুতই: ১. কয়েক বছরের মধ্যেই দেশে দ্রুত উন্নত ও আবহাওয়া-সহিষ্ণু গমের জাত উদ্ভাবন করা সম্ভব হবে। ২. গমের আমদানি নির্ভরতা কমবে এবং দেশীয় উৎপাদন বাড়বে। ৩. কৃষকরা পাবেন উচ্চ ফলনশীল ও লাভজনক জাতের নিশ্চিত সরবরাহ।
উপসংহার
দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থার পথে এটি হতে পারে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এটি শুধু একজন অসাধারণ বিজ্ঞানীর সাফল্যের গল্প নয়। এটি কঠোর পরিশ্রম আর উন্নত প্রযুক্তি—এই দুইয়ের মিলে অসম্ভবকে সম্ভব করার বাস্তব প্রমাণ।
সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টর নিজাম আহমেদের এই গবেষণা দেখিয়ে দিয়েছে, বিজ্ঞানের শক্তি শুধু ল্যাবরেটরিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা মানুষের খাদ্য, জীবিকা আর ভবিষ্যতের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে।
