জীবজগতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অণু হলো ডিঅক্সি রাইবো নিউক্লিক অ্যাসিড, যাকে সংক্ষেপে বলা হয় ডিএনএ (DNA)। জীবকোষের ক্রোমোজমের মধ্যেই মূলত এর অবস্থান। ডিএনএ অণু দুটো লম্বা সুতোর মতো পরস্পরকে পেঁচিয়ে থাকে। তাদের এই প্যাঁচানো কাঠামোটিকে বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন ডিএনএ ডবল হিলিক্স।
এই ডবল হিলিক্স কাঠামোটি তৈরি হয়েছে ডিঅক্সি রাইবোস, ফসফেট এবং চার ধরণের নাইট্রোজেন বেইস দিয়ে। এদের নাম হলো অ্যাডেনিন, থায়মিন, গুয়ানিন এবং সাইটোসিন। সংক্ষেপে এদেরকে নামের চারটি আদ্যক্ষর ATGC দিয়ে প্রকাশ করা হয়। ডিএনএ ডবল হিলিক্সের ভেতর A জোড় বেঁধে থাকে T-এর সাথে এবং C জোড় বেঁধে থাকে G-এর সাথে।
জীবনের ব্লুপ্রিন্ট ও জিনোম
ডিএনএ বর্ণমালার এই চারটি অক্ষর ATGC দিয়েই সকল জীবের জিনোম রচিত হয়েছে। জিনোম বলতে কোনো জীবের সামগ্রিক ডিএনএ বিন্যাসকে বোঝায়। যেমন ধরুন, মানুষের জিনোমে রয়েছে প্রায় তিন বিলিয়ন AT এবং GC বেইস জোড়। তথ্য ভাণ্ডার হিসেবে এটি বিশাল বড়।
মানুষের জিনোমে রক্ষিত সকল ATGC-কে যদি ধারাবাহিকভাবে A4 সাইজের কাগজে প্রিন্ট করে স্ট্যাক করে রাখা হয়, তাহলে তার উচ্চতা হবে আনুমানিক ১৭০ মিটার। অর্থাৎ এটি নিউইয়র্কের স্ট্যাচু অফ লিবার্টির চেয়েও উঁচু। মানবদেহে প্রায় ৩০–৩৭ ট্রিলিয়ন কোষ রয়েছে। প্রতিটি কোষের ডিএনএর ভেতরে এই বিপুল পরিমাণ তথ্য রয়েছে।
তাহলে দেখা যাচ্ছে, ডিএনএ বিপুল পরিমাণ তথ্যকে অত্যন্ত ক্ষুদ্র স্থানে সন্নিবেশিত করে রাখে। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মে ডিএনএ অণুর ভেতরে জীবনের যাবতীয় তথ্যকে ধারণ করেছে এবং বংশ-পরম্পরায় ছড়িয়ে দিয়েছে। ডিএনএ অণুকে অনেকে বলেন “দি মাস্টার মলিকিউল অফ লাইফ”। এক কথায় বলা যায়, জীবনের ব্লুপ্রিন্টকে ধারণ ও বহন করে ডিএনএ অণু।
ডিএনএ ডেটা স্টোরেজ প্রযুক্তির সূচনা
মজার ব্যাপার হলো, জীব বৈশিষ্ট্যের ধারক ও বাহক ডিএনএ অণুকে বিজ্ঞানীরা এখন ডিএনএ ডেটা স্টোরেজ বা আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির কাজে লাগাচ্ছেন। বিজ্ঞানীদের মতে, ডিএনএ অণু যদি সার্থকভাবে জীবজগতের সকল তথ্যকে ধারণ করতে পারে, তাহলে ইলেকট্রনিক তথ্যপ্রযুক্তির ডেটাকে ধারণ করার ক্ষেত্রেও একে কাজে লাগানো যাবে।
আমরা জানি কম্পিউটারের সকল তথ্য বাইনারি কোডে লেখা থাকে—০ আর ১। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, ডিএনএ অণুর ক্ষেত্রেও ATGC-কে বাইনারি কোডে প্রকাশ করা সম্ভব। যেমন ধরুন:
- A = 00
- T = 11
- G = 10
- C = 01
এ ধরনের কোড ব্যবহার করে যেকোনো ডিজিটাল ডেটাকে ডিএনএর ATGC কোডে রূপান্তর করা সম্ভব। তারপর সেই ডিএনএ কোডকে সংশ্লেষণ করে কৃত্রিম ডিএনএতে রূপান্তরিত করা যাবে। এইভাবে কোনো ছায়াছবি, উপন্যাস কিংবা গানকে সংশ্লেষিত কৃত্রিম ডিএনএতে রূপান্তরিত করে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা সম্ভব।
গবেষণার ইতিহাস ও সাফল্য
২০১২ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানীরা সর্বপ্রথম ৭৩৯ কিলোবাইট ডিজিটাল ডেটাকে ডিএনএ ডেটায় রূপান্তরিত করেছিলেন। এর মধ্যে ছিল শেক্সপিয়ারের সনেট এবং মার্টিন লুথার কিং-এর সেই ঐতিহাসিক ভাষণ।
এর চার বছর পর, ২০১৬ সালে মাইক্রোসফট ও ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের গবেষকরা আগের রেকর্ড ভেঙে ২০০ মেগাবাইট ডিজিটাল ডেটা ডিএনএ ডেটায় রূপান্তরিত করেন। এর মধ্যে ছিল জাতিসংঘের সার্বজনীন মানবাধিকার সনদ এবং একটি মিউজিক ভিডিও। এরপর থেকে পরীক্ষামূলক ডিএনএ ডেটা স্টোরেজ-এর পরিমাণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সম্প্রতি গবেষকেরা একটি নতুন ধরনের ডিএনএ মাইক্রোচিপ তৈরি করেছেন, যেটা প্রচলিত ডিএনএ প্রযুক্তির তুলনায় ১০০ গুণ বেশি তথ্য ধারণ করতে পারে। এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে ডিএনএ থেকে তথ্য উদ্ধারের গতি ৩,২০০ গুণ বাড়ানো সম্ভব বলে পরীক্ষায় দেখা গেছে। একইসাথে ডিএনএকে সিলিকা ন্যানোপার্টিকলের ভেতরে সংরক্ষণ করে একে আরও দীর্ঘস্থায়ী করার উপায়ও আবিষ্কৃত হয়েছে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
এখন প্রশ্ন হলো, সংরক্ষিত তথ্যকে ডিএনএর ভেতর থেকে উদ্ধার করে কীভাবে কাজে লাগানো যাবে? এর জন্য করতে হবে ডিএনএ সিকোয়েন্সিং। অর্থাৎ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ডিএনএ অণুর ভেতর ATGC বেইসগুলো কীভাবে সাজানো রয়েছে সেটা বের করতে হবে। একসময় এটি খুব কঠিন ও ব্যয়বহুল কাজ ছিল।
এখন স্বয়ংক্রিয় হাই-থ্রুপুট সিকোয়েন্সিং মেশিনের সাহায্যে আগের চেয়ে অনেক দ্রুত ডিএনএ সিকোয়েন্স করা যায়। তবে তথ্য প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজন হবে আরও অনেক দ্রুতগতিতে সিকোয়েন্সিং, যেটা সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে ডিএনএর ভেতরের যাবতীয় তথ্য উদ্ধার করে ফেলবে। এজন্য হয়তো আরও কয়েক দশক অপেক্ষা করতে হতে পারে।
ডিএনএর ভেতর ডিজিটাল ডেটা সংরক্ষণের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর বিশাল ধারণক্ষমতা এবং দীর্ঘকাল টিকে থাকার সক্ষমতা। এজন্যই তথ্যপ্রযুক্তি এবং জীবপ্রযুক্তির গবেষকেরা ডিজিটাল ডেটা ডিএনএতে সংরক্ষণের সম্ভাবনা নিয়ে জোর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। অনেকেই মনে করেন, ভবিষ্যতে ইন্টারনেটের সব তথ্যই ডিএনএ অণুর ভেতরে সংরক্ষণ করে রাখা যাবে।
