৩০ বছরের মাইলফলক
২০২৫ সালে বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেট (BEC) তৈরি করার ত্রিশ বছর পূর্ণ হলো। ১৯৯৫ সালে প্রথমবারের মতো পরীক্ষাগারে তৈরি হওয়া পদার্থের এই বিশেষ অবস্থাটি দেখিয়েছিল, খুব ঠান্ডা পরিবেশে পরমাণুরা কত ভিন্নভাবে আচরণ করতে পারে।
সাধারণ অবস্থায় পরমাণুগুলো যেভাবে চলে, তার সাথে এর কোনো মিল থাকে না। তাপমাত্রা যদি অসম্ভব রকম কমে যায়, তখন তারা আচমকাই একই ছন্দে কাঁপতে থাকে। সবাই মিলে যেন একটাই কণা হয়ে গেছে। এটিই হচ্ছে পদার্থের পঞ্চম অবস্থা—বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেট।
১৯২৪ সাল: উপেক্ষিত গবেষণা ও আইনস্টাইন
এই গল্পটা শুরু হয়েছিল ১৯২৪ সালে। সে বছর, সদ্য স্থাপিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ অধ্যাপক সত্যেন্দ্রনাথ বসু আলোর কণা বা ফোটন গণনার এক নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করলেন। তিনি তাঁর গবেষণাপত্রটি পাঠিয়েছিলেন ব্রিটেনের বিখ্যাত ফিলোসফিক্যাল ম্যাগাজিন-এ।
কিন্তু এই গবেষণাপত্রটি ব্রিটিশ পত্রিকায় ছাপা হলো না। সম্পাদকরা মনে করলেন, এই গবেষণাটি প্রকাশের উপযুক্ত নয়; তাই বাতিল করে পাঠিয়ে দিলেন অধ্যাপক বসুর কাছে। কিন্তু হার মানার পাত্র নন তিনি। কারণ তিনি জানতেন, তাঁর গবেষণার সুদূরপ্রসারী সম্ভবনা রয়েছে। তাই তিনি সাহসের সাথে গবেষণাপত্রটি পাঠিয়ে দিলেন পদার্থবিজ্ঞানের দিকপাল জার্মানীর আলবার্ট আইনস্টাইনের কাছে।
আইনস্টাইনের খ্যাতি তখন বিশ্বব্যাপী। কথায় বলে জহুরী জহর চেনে। আইনস্টাইন গবেষণাপত্রটি পড়ে বুঝতে পারলেন এর মর্মকথা। তিনি নিজেই জার্মান ভাষায় অনুবাদ করে পাঠিয়ে দিলেন জার্মানির বিখ্যাত জার্নাল সাইটস্রিফট ফুর ফিজিকে (Zeitschrift für Physik)-এ, সঙ্গে নিজের একটি সুপারিশপত্রও দিলেন গবেষণাটির গুরুত্ব বুঝানোর জন্য। গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হবার পর আর ফিরে তাকাতে হয়নি অধ্যাপক বসুকে।
তাত্ত্বিক ভবিষ্যদ্বাণী ও চ্যালেঞ্জ
আইনস্টাইন তাঁর কাজ দেখে মুগ্ধ হয়ে সেটি শুধু প্রকাশই করলেন না, বসুর ধারণা কিভাবে বস্তুগত কণায়ও প্রয়োগ করা যায় সেটাও দেখালেন। তিনি বললেন, একই ধরনের কণার একটি গ্যাস যদি খুব কম তাপমাত্রায় আনা যায়, তবে তারা নিজেদের আলাদা পরিচয় ভুলে একটি অভিন্ন অবস্থায় চলে যাবে।
এটিই ছিল কালজয়ী ভবিষ্যদ্বাণী—বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেট-এর তাত্ত্বিক ধারণা। কিন্তু সমস্যা হলো, তাপমাত্রা কমাতে কমাতে গ্যাস সাধারণত কঠিন হয়ে যায়। তাই বহু দশক এই তত্ত্ব কেবল বইয়ের পাতাতেই রয়ে গেল।
১৯৯৫: অসম্ভবকে সম্ভব করা
১৯৯৫ সালে এরিক কর্নেল ও কার্ল উইমন সেই অসম্ভব কাজটাই করে দেখালেন। তাঁরা রুবিডিয়াম-৮৭ পরমাণুর পাতলা গ্যাসকে ব্যবহার করলেন।
- লেজার কুলিং: প্রথমে লেজার কুলিংয়ের মাধ্যমে গ্যাসকে ধীর করা হলো। লেজার আলো এমনভাবে লাগানো হলো, যাতে দ্রুতগতির পরমাণুগুলো আলো শোষণ করে একটু একটু করে গতি হারাতে লাগল এবং গ্যাস ঠান্ডা হলো।
- ইভাপোরেটিভ কুলিং: এরপর শুরু হলো বাষ্পীয় শীতলীকরণ। দ্রুত পরমাণুগুলোকে পালিয়ে যেতে দেওয়া হলো, আর ধীরগুলিকে চৌম্বকক্ষেত্রে ধরে রাখা হলো। দ্রুত পরমাণুগুলো বেরিয়ে যাওয়ায় গ্যাস আরও ঠান্ডা হয়ে গেল—ঠিক যেমন শরীরের ঘাম শুকিয়ে শরীর ঠান্ডা হয়।
অবশেষে তাপমাত্রা যখন নামল এক কোটি ভাগেরও কম কেলভিনে, তখন প্রায় দুই হাজার রুবিডিয়াম পরমাণু হঠাৎ করেই একই কোয়ান্টাম অবস্থায় এসে জড়ো হয়ে গেল। এটাই পৃথিবীর প্রথম বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেট। আকারে খুবই ছোট, কিন্তু বিজ্ঞান ইতিহাসে বিশাল এক মাইলফলক।
পরবর্তীতে এমআইটি (MIT)-এর গবেষক ভল্ফগ্যাং কেটারলে আরও বড় ও স্থিতিশীল কনডেনসেট তৈরি করেন। লক্ষ লক্ষ পরমাণু একই পরমাণুর মত আচরণ করছে—এই বিষয়টি এতটাই নির্ভুল ছিল যে সেখান থেকে ‘অ্যাটম লেজার’ বের করা সম্ভব হয়েছিল।
নোবেল স্বীকৃতি ও বর্তমান ব্যবহার
২০০১ সালে কর্নেল, উইমন ও কেটারলে এই অভাবনীয় কাজের জন্য নোবেল পুরস্কার পান। আজ বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেট শুধু গবেষণার কৌতূহল নয়। এটি ব্যবহৃত হচ্ছে:
- অত্যন্ত সূক্ষ্ম পরিমাপে।
- অ্যাটম ইন্টারফেরোমেট্রিতে।
- কোয়ান্টাম সিমুলেশনে।
- সুপারফ্লুইডিটি গবেষণায়।
- ভবিষ্যতের কোয়ান্টাম প্রযুক্তিতে।
এমনকি মহাকাশ বিজ্ঞানেও এর প্রভাব পড়ছে।
উপসংহার
মোদ্দা কথা হলো, বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেট আমাদের দেখায়, প্রকৃতি যতটা জটিল মনে হয়, তার চেয়ে আরও গভীরে লুকিয়ে আছে কোয়ান্টাম জগতের বিস্ময়। আর সঠিক পরিবেশে সেই বিস্ময় আমরা হাতের মুঠোয় ধরতেও পারি।
