Wednesday, January 14, 2026

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ওয়েব সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।  আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeনোবেল পুরষ্কারবারবারা ম্যাককিলন্টক: জাম্পিং জিনের জননী ও নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী

বারবারা ম্যাককিলন্টক: জাম্পিং জিনের জননী ও নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী

বিস্মৃতপ্রায় এক নোবেলজয়ী

সাধারণত সমসাময়িক কালের যুগান্তকারী কোনো আবিষ্কারের জন্যই বিজ্ঞানের তিনটি শাখায় প্রতিবছর নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। কিন্তু ১৯৮৩ সালের জীববিজ্ঞানের নোবেল পুরস্কারটি দেয়া হয়েছিল এমন একজন বিজ্ঞানীকে, যার অবদানের কথা অনেকেই প্রায় ভুলেই গিয়েছিলেন।

এই বিস্মৃতপ্রায় বিজ্ঞানীর নাম হলো বারবারা ম্যাককিলন্টক। যে আবিষ্কারটির জন্য তাঁকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছিলো, সেটি তিনি করেছিলেন প্রায় চল্লিশ বছর আগে। দুঃখজনক ব্যাপার হলো, এই কাজটির জন্য সে সময় তিনি ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছিলেন। অন্যভাবে বলতে হয়, তিনি নারী হওয়ার কারণে তাঁর ঐ প্রথাবিরোধী আবিষ্কারটি সেই সময়ের পুরুষপ্রধান বিজ্ঞানীমহল সহজভাবে গ্রহণ করেনি।

প্রারম্ভিক জীবন ও বিজ্ঞানে আগ্রহ

বারবারার জন্ম হয়েছিল ১৯০২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাট অঙ্গরাজ্যে। বাবা ছিলেন হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার। ছোটবেলা থেকেই বারবারার ছিল বিজ্ঞান নিয়ে অসীম উৎসাহ।

সে সময় মেয়েদের জন্য বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করা খুব সহজ ব্যাপার ছিল না। বিশেষত এ ব্যাপারে তাঁর মায়ের রীতিমতো আপত্তি ছিল। কিন্তু বাবার উৎসাহে তিনি কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলেন এবং লেখাপড়া করলেন জেনেটিক্সের মত একটি কঠিন বিষয় নিয়ে।

সাইটোজেনেটিক্সে নতুন দিগন্ত

বারবারা পিএইচডি শেষ করলেন ১৯২৭ সালে। তাঁর প্রচন্ড আগ্রহ ছিল সাইটোজেনেটিক্সে। তিনি খুব ভালো স্লাইড তৈরি করতে পারতেন। ঘন্টার পর ঘন্টা বসে মাইক্রোস্কোপের নীচে তিনি ক্রোমোজোম পর্যবেক্ষণ করতেন। এসব পর্যবেক্ষণের বেশ কিছু নতুন পদ্ধতিও তিনি উদ্ভাবন করেন।

তাঁর নিবিড় পর্যবেক্ষণের ফলে সাইটোজেনেটিক্সের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সে সময় আবিষ্কৃত হয়েছিলো:

  • মেয়োসিসের সময় ক্রোমোজোমের মধ্যে যে ‘ক্রসিং ওভার’ (crossing over) হয়, সেটা বারবারাই প্রথম প্রত্যক্ষ করেন।
  • ক্রোমোজোমের সেন্ট্রোমিয়ার এবং টেলোমিয়ারের ভূমিকা তিনিই প্রথম ব্যাখ্যা করেন।
  • তিনিই প্রথম ভুট্টার দশটি ক্রোমোজোমের জেনেটিক ম্যাপ তৈরি করেছিলেন।

জাম্পিং জিন তত্ত্ব ও সমালোচনা

চল্লিশের দশকে নিউইয়র্কের কোল্ড স্প্রিং হারবার ল্যাবরেটরিতে কাজ করার সময় তিনি ভুট্টার ক্রোমোজোমের মধ্যে বেশকিছু অসামঞ্জস্য লক্ষ্য করলেন। তাঁর কাছে মনে হল ক্রোমোজোমের ভেতর কিছু কিছু জিন (gene) সব সময় একই জায়গায় অবস্থান করে না।

এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার জন্য তিনি আরো অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেন। বিভিন্ন জাতের ভুট্টা নিয়ে সংকরায়ন করে তিনি কয়েক হাজার পর্যবেক্ষণ করলেন। তারপর তিনি নিশ্চিত হলেন তাঁর পর্যবেক্ষণে কোনো ভুল নেই। তিনি আরও লক্ষ্য করলেন জিনের অবস্থান পরিবর্তনের সাথে সাথে ভুট্টার দানার রংও পরিবর্তিত হয়ে যায়। তিনি তখন বুঝতে পারলেন জিনের বহিঃপ্রকাশের জন্য এই অবস্থান পরিবর্তনের একটি ভূমিকা রয়েছে।

তিনি তাঁর পরীক্ষার ফলাফল গবেষণাপত্র আকারে প্রকাশ করলেন।‌ দুঃখজনকভাবে তখন তিনি ব্যাপক সমালোচনার সম্মুখীন হলেন। তৎকালীন বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীরা তাঁর এই গবেষণার ফলাফল মেনে নিতে পারলেন না। কারণ সে সময় ধারণা করা হতো ক্রোমোজোমের ভেতরে জিনগুলো অনড় অবস্থানে থাকে।

সেজন্য কেউ বারবারার এই অভিনব “জাম্পিং জিন” তত্ত্ব মানতে চাইলেন না। এক বিখ্যাত বিজ্ঞানী তো বলেই বসলেন, বারবারার স্ট্যাটিসটিক্যাল জ্ঞানে কিছু ঘাটতি রয়েছে, সেজন্যই গবেষণার ফলাফলে কিছু উল্টোপাল্টা হয়েছে।‌ এসব মন্তব্যে বারবারা প্রচন্ড মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি এ বিষয় নিয়ে আর নতুন কোনো গবেষণাপত্র প্রকাশ করেননি।

মলিক্যুলার বায়োলজি ও সত্যের জয়

আসলে সে সময় ডিএনএ অণুর গঠন এবং কার্যপ্রণালী নিয়ে বিজ্ঞানীদের তেমন কোনো ধারণা ছিল না।‌ কিন্তু পরবর্তী দশকগুলোতে মলিক্যুলার বায়োলজিতে ব্যাপক গবেষণা হওয়ার ফলে বিজ্ঞানীরা জিনের কার্যপ্রণালী সম্বন্ধে অনেক নতুন বিষয় আবিষ্কার করেছেন।

তাঁরা ডিএনএ অণুর ভেতর ট্রান্সপোসেবল এলিমেন্ট বা ট্রান্সপোসনের (transposon) সন্ধান পেয়েছেন, যেগুলো কার্যত বারবারার সেই “জাম্পিং জিন” ছাড়া আর কিছুই নয়। ট্রান্সপোসনগুলো ডিএনএ অণুর মধ্যে তাদের স্থান পরিবর্তন করে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন ভুট্টা ছাড়াও আরো অনেক প্রাণী, উদ্ভিদ, ব্যাকটেরিয়া এমনকি ভাইরাসের ক্ষেত্রেও ট্রান্সপোসনগুলো জিন রেগুলেশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

নোবেল স্বীকৃতি ও তুলনা

সত্তরের দশকের শেষে এসে বারবারার “জাম্পিং জিন” তত্ত্ব বিজ্ঞানী মহলে স্বীকৃতি পেয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে তিনি ১৯৮৩ সালে জীববিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। বয়স তখন তাঁর আশি পেরিয়ে গেছে। শেষ বয়সে এসে তিনি তাঁর কাজের স্বীকৃতি পেয়েছিলেন, এটাই ছিল তাঁর সান্ত্বনা।

সারা জীবন তিনি ছিলেন অকৃতদার। ল্যাবরেটরিই ছিল তাঁর ঘর সংসার। বিজ্ঞানকে সাথী করে সারা জীবন কাটিয়েছেন। নোবেল কমিটি তাঁদের সম্মাননায় বারবারার কাজকে তুলনা করেছিলেন জেনেটিক্সের জনক গ্রেগর জোহান মেন্ডেলের কাজের সাথে। এর চেয়ে সম্মানের আর কি হতে পারে?

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular