এক সময় মানুষ চাঁদে গিয়েছিল, তারপর তার সেই অভিযাত্রা থেমে গিয়েছিল। ১৯৬৯ সালের সেই ঐতিহাসিক অ্যাপোলো ১১ অভিযানের পর ১৯৭২ সাল পর্যন্ত মানুষ মোট ছয়বার চাঁদে গেছে। তারপর অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে চাঁদ যেন মানুষের পদচিহ্নের প্রতীক্ষায় আছে।
আর এখন, সেই নীরব অপেক্ষায় অবসান ঘটতে চলেছে। আবার চন্দ্রযাত্রা শুরু করেছে মানবসভ্যতা। এই নতুন অভিযাত্রার নাম, আর্টেমিস মিশন। আবারো চাঁদে ফেরা, তবে আগের মতো নয়; আরও গভীর, আরও স্থায়ী, আরও ভবিষ্যতমুখী।
অ্যাপোলো থেকে আর্টেমিস: এক ধারাবাহিক উত্তরাধিকার
১৯৬০ ও ৭০ এর দশকে অ্যাপোলো কর্মসূচির মাধ্যমে মানুষ প্রথমবারের মতো চাঁদের মাটিতে পা রেখেছিল। কিন্তু সেই অভিযান মূলত ছিল রাজনৈতিক ও কারিগরি সক্ষমতার প্রদর্শন। কিন্তু আর্টেমিস ঠিক উল্টো পথে হাঁটছে। এর লক্ষ্য শুধু চাঁদে যাওয়া নয়, চাঁদে থাকা।
গ্রিক পুরাণে অ্যাপোলো ছিলেন সূর্যের দেবতা, আর তাঁর যমজ বোন আর্টেমিস ছিলেন চাঁদের দেবী। আর এই নামের মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে একটি নীরব বার্তা। এবারের চন্দ্রযাত্রা হবে আরও সম্পূর্ণ, আরও ভারসাম্যপূর্ণ।
আর্টেমিসের মূল লক্ষ্য কী?
আর্টেমিস কর্মসূচির লক্ষ্যগুলো এক কথায় বলা যাবে না। এগুলো ধাপে ধাপে গড়ে ওঠা এক সুদীর্ঘ মহা পরিকল্পনা:
- পুনরায় চন্দ্রবক্ষে: দীর্ঘ বিরতির পর মানুষকে আবার চাঁদে পাঠানো।
- ইতিহাস সৃষ্টি: প্রথমবারের মতো একজন নারী এবং একজন অশ্বেতাঙ্গ মানুষকে চাঁদের মাটিতে নামানো।
- স্থায়ী ঘাঁটি: চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে স্থায়ী ঘাঁটি গড়ে তোলা। যেখানে বরফ, পানি ও ভবিষ্যৎ জ্বালানির সম্ভাবনা রয়েছে।
- মঙ্গলের সিঁড়ি: সবচেয়ে বড় কথা, চাঁদকে ব্যবহার করা হবে মঙ্গল অভিযানের প্রস্তুতিক্ষেত্র হিসেবে। চাঁদ এখানে শেষ গন্তব্য নয়, চাঁদ হবে ভবিষ্যতে মঙ্গলে যাওয়ার সিঁড়ি।
ধাপে ধাপে আর্টেমিস মিশন
নাসার এই মহাকাশ অভিযানকে কয়েকটি প্রধান ধাপে ভাগ করা হয়েছে:
১. আর্টেমিস-১ (সম্পন্ন): ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে আর্টেমিস-১ মিশন ছিল একটি মানববিহীন পরীক্ষা অভিযান। শক্তিশালী SLS রকেটে চড়ে ওরিয়ন মহাকাশযান চাঁদের কক্ষপথ ঘুরে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে এসেছে। এটি প্রমাণ করেছে যন্ত্রপাতি প্রস্তুত, পথ নিরাপদ।
২. আর্টেমিস-২ (আসন্ন): ২০২৬ সালে, আর্টেমিস–২ মিশন হবে মানবসহ চন্দ্রকক্ষপথ ভ্রমণ। মানুষ আবার চাঁদকে খুব কাছ থেকে দেখবে, তবে এখনও অবতরণ নয়। নাসার পরিকল্পনা অনুযায়ী মিশনটির উৎক্ষেপণ হতে পারে ২০২৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ এপ্রিলের মধ্যে। ১০ দিনের এই অভিযানে ক্রু হিসেবে থাকবেন যুক্তরাষ্ট্রের রিড উইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা হ্যামক কখ এবং কানাডার জেরেমি হ্যানসেন।
৩. আর্টেমিস-৩ (ঐতিহাসিক অবতরণ): এর পর আসবে আর্টেমিস-৩ মিশন। এই নামটাই ইতিহাসের পাতায় নতুন করে লেখা হবে। কারণ এই অভিযানে মানুষ অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পরে আবার চাঁদের মাটিতে নামবে। ২০২৭ সালের দিকে এই মিশনটি হতে পারে, আর গন্তব্য হবে চাঁদের সবচেয়ে রহস্যময় ও সম্ভাবনাময় এলাকা—দক্ষিণ মেরু অঞ্চল।
চাঁদের দক্ষিণ মেরু ও পানির খোঁজ
চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে সূর্যালোকের সল্পতায় গভীর ছায়াযুক্ত গর্তে বরফ জমা পানির সম্ভাবনা রয়েছে। এখানে ভবিষ্যৎ “লুনার বেস” তৈরির সুযোগ সবচেয়ে বেশি। সব মিলিয়ে আর্টেমিস-৩ শুধু একটি ল্যান্ডিং মিশন নয়, বরং চাঁদে দীর্ঘমেয়াদি মানব উপস্থিতির দরজা খুলে দেওয়ার অভিযান।
চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি ও ‘গেটওয়ে’
আর্টেমিস কর্মসূচির সবচেয়ে যুগান্তকারী দিক হলো, এটা শুধু “চাঁদে গিয়ে ফিরে আসা” নয়, বরং চাঁদে টিকে থাকার জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি। এই লক্ষ্য পূরণে নাসার পরিকল্পনায় আছে দুটি বড় স্তম্ভ:
- আর্টেমিস বেস ক্যাম্প: চাঁদের মাটিতেই বসবাসযোগ্য আবাসন, গবেষণাগার এবং আধুনিক রোভারসহ এমন একটি স্থায়ী ঘাঁটি, যেখানে বিজ্ঞানীরা দিনের পর দিন কাজ করতে পারবেন।
- লুনার গেটওয়ে: চাঁদের কক্ষপথে ভেসে থাকা একটি ছোট কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মহাকাশ স্টেশন। যেটা ভবিষ্যতে চাঁদে যাতায়াত সহজ করবে, পাশাপাশি মঙ্গল অভিযানের আগে ট্রানজিট হাব হিসেবে কাজ করবে।
সব মিলিয়ে, আর্টেমিস যেন ধীরে ধীরে আমাদের সামনে খুলে দিচ্ছে একটি নতুন চন্দ্রসভ্যতার দরজা।
বৈশ্বিক সহযোগিতা
এই মহাযজ্ঞের নেতৃত্বে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নাসা। তবে আর্টেমিস একক কোনো দেশের প্রকল্প নয়। ইউরোপ, কানাডা, জাপানসহ বহু দেশ এতে অংশীদার। বেসরকারি সংস্থাও যুক্ত রয়েছে, বিশেষ করে ল্যান্ডার ও রকেট প্রযুক্তির উন্নয়নে।
পারস্পরিক সহযোগিতাই এখন আধুনিক মহাকাশ অভিযানের নতুন রীতি। একক দেশের পক্ষে এত বড় অভিযান পরিচালনা করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং কষ্টসাধ্য।
কেন এই মিশন গুরুত্বপূর্ণ?
এই মিশন আমাদের মনে করিয়ে দেয় মানুষ শুধু পৃথিবীতে আটকে থাকার জন্য জন্মায়নি। চাঁদে পানির সন্ধান মানে ভবিষ্যৎ জ্বালানির উৎস খুঁজে পাওয়া। চাঁদে বসবাসের মানে দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ জীবন। আর তাই আর্টেমিসের মানে মঙ্গলের পথে মানুষের প্রথম বাস্তব পদক্ষেপ।
সবচেয়ে বড় কথা, আর্টেমিস আমাদের সেই পুরোনো প্রশ্নের সামনে আবার দাঁড় করিয়ে দেয়—মহাবিশ্বে আমরা কি একা? আর যদি না হই, তাহলে সেখানে পৌঁছানোর সাহস কি আমাদের আছে?
শেষ কথা
আর্টেমিস মিশন কোনো একক রকেট উৎক্ষেপণ নয়। এটি একটি প্রজন্মের স্বপ্ন, বহু দশকের প্রস্তুতি, আর ভবিষ্যতের দিকে ছোড়া একটি সাহসী তীর। যেদিন আবার চাঁদের মাটিতে মানুষের পদচিহ্ন পড়বে, সেদিন আমরা শুধু অতীতে ফিরবো না, আমরা সামনে এগিয়ে যাবো—দূরে আরো বহুদূরে, সুদূর ভবিষ্যতের নক্ষত্রলোকের পথে।
এই ভিডিওটিতে আর্টেমিস ২ মিশনকে খুব সুন্দর করে ব্যাখা করা হয়েছে
