Thursday, January 15, 2026

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ওয়েব সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।  আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeপদার্থ বিজ্ঞানবিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব: আইনস্টাইন ও পয়েনকেয়ারের অজানা ইতিহাস

বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব: আইনস্টাইন ও পয়েনকেয়ারের অজানা ইতিহাস

আপেক্ষিকতার নেপথ্য নায়ক

উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে, অঁরি পয়েনকেয়ার নামের এক ফরাসি বিজ্ঞানী ও দার্শনিক সময়ের আপেক্ষিকতা নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা করছিলেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন—একটি ঘটনা যদি একজন চলন্ত ট্রেনের ভেতর থেকে দেখে, আর আরেকজন বাইরে থেকে দেখে, তাহলে তাদের দুজনের দেখার অভিজ্ঞতা কি এক রকম হবে?

তিনি মনে করতেন, সময় সবার জন্য এক নয়; বরং এটা নির্ভর করে কে কোথা থেকে দেখছে এবং কীভাবে সময় মাপছে তার ওপর। তাঁর মতে, সময় একটা সমঝোতা মাত্র। দুইজন পর্যবেক্ষকের মধ্যে আলো পাঠিয়ে ও ফিরিয়ে এনে সময়ের যে হিসেব পাওয়া যায়, সেটাই ব্যবহারযোগ্য সময়।

১৮৯৮ সালে তাঁর “La mesure du temps” প্রবন্ধে তিনি এই চিন্তাগুলো উপস্থাপন করেন। এরপর ১৯০৪ সালে এক বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে তিনি বলেন, সব ভৌত নিয়ম সব পর্যবেক্ষকের জন্য একই হওয়া উচিত।

গণিত ও দর্শনের মিশেল

১৯০৫ সালের জুনে তিনি “Sur la dynamique de l’électron” নামে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি লোরেঞ্জ রূপান্তরের (Lorentz transformations) গাণিতিক ধারণা ব্যবহার করে দেখান:

  • কোনো বস্তু আলোর গতির কাছাকাছি চললে তার জন্য সময় ধীরে চলে।
  • বস্তুর দৈর্ঘ্য সংকুচিত হয়ে যায়।

তবে তিনি স্পষ্টভাবে কখনো বলেননি যে, এটাই আপেক্ষিকতার মূলকথা। তিনি এটিকে লোরেঞ্জের রূপান্তরের একটি গাণিতিক ও দার্শনিক পরিমার্জন হিসেবে লিখেছিলেন, কোনো নতুন স্বতন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে নয়। তাছাড়া লোরেঞ্জের মতো তিনিও ইথারের প্রচলিত ধারণাকেও বাদ দেননি।

আইনস্টাইন ও ১৯০৫ সাল

অন্যদিকে, প্রায় একই সময়ে সুইজারল্যান্ডের বার্ন শহরের পেটেন্ট অফিসে কাজ করছিলেন এক অখ্যাত তরুণ, নাম আলবার্ট আইনস্টাইন। তিনি ভাবছিলেন, যদি কেউ আলোর গতিতে চলে, তাহলে তার জন্য আলোর রশ্মি কি স্থির হয়ে যাবে? কিন্তু ম্যাক্সওয়েলের তত্ত্ব অনুযায়ী, আলো সব পর্যবেক্ষকের জন্য একই গতিতে চলে। তাই তিনি বুঝতে পারলেন, হয় আলোর গতি ব্যতিক্রমী, না হয় সময় ও স্থান নিয়ে আমাদের প্রচলিত ধারণাই ভুল।

এই চিন্তার ভিত্তিতে ১৯০৫ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি “Zur Elektrodynamik bewegter Körper” নামের গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন, যা এখন বিশেষ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব হিসেবে সারা বিশ্বে পরিচিত। তিনি দুটি মূল স্বীকার্য দেন: ১. সব ইনর্শিয়াল পর্যবেক্ষকের জন্য পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো একই। ২. আলোর গতি সব পর্যবেক্ষকের জন্য ধ্রুবক।

আইনস্টাইন ইথারের ধারণাকে একেবারেই বাতিল করে দেন, কারণ সেটা ছিল অপ্রয়োজনীয়। তিনি সাহস করে বললেন, যে বস্তু যত দ্রুত চলে, তার জন্য সময় তত ধীরে চলে এবং তার দৈর্ঘ্য সংকুচিত হয়ে যায়। কোনো ঘটনা এক পর্যবেক্ষকের কাছে যে সময়ে ঘটে, সেটা অন্যের কাছে ভিন্ন সময়ে ঘটতে পারে।

পার্থক্য ও দৃষ্টিভঙ্গি

আইনস্টাইন তাঁর এই যুগান্তকারী গবেষণাপত্রে লোরেঞ্জের রূপান্তরের কথা উল্লেখ করলেও, পয়েনকেয়ারের গবেষণা নিয়ে কিছু বলেননি। তবে মূল পার্থক্যটা ছিল দৃষ্টিভঙ্গিতে:

  • পয়েনকেয়ার: আপেক্ষিকতার বিষয়গুলো গাণিতিক পরিসরে আলোচনা করেছিলেন এবং ইথারের অস্তিত্বে বিশ্বাস রেখেছিলেন। তিনি হয়তো আরও ভেবেচিন্তে কথা বলতে চেয়েছিলেন, অথবা লোরেঞ্জের প্রতি সম্মান রেখে নিজের অবস্থান একটু আড়ালে রেখেছিলেন।
  • আইনস্টাইন: তিনি সেগুলোর বাস্তবতা নিয়ে সরাসরি বক্তব্য দেন এবং সাহসিকতার সাথে আপেক্ষিকতার নতুন তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, স্থান ও কালের পরিবর্তন কোনো গাণিতিক কায়দা নয়, বরং এটাই প্রকৃতির নিয়ম।

ইতিহাসের বিচার

এই কারণেই বিজ্ঞানের ইতিহাসে পয়েনকেয়ারকে সম্মান জানানো হয়, কিন্তু আইনস্টাইনকে মনে রাখা হয়। কারণ তিনিই আপেক্ষিকতার তত্ত্বকে এমনভাবে প্রকাশ করেছিলেন, যাতে সারা বিশ্ব সেটা বুঝতে পারে এবং গ্রহণ করে।

তাই বলা যায়, পয়েনকেয়ার আপেক্ষিকতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু এর দরজাটা খুলেছিলেন আইনস্টাইন।

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular