Thursday, January 15, 2026

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ওয়েব সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।  আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeনোবেল পুরষ্কারকসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড: মহাবিশ্বের আদিমতম আলো ও বিগ ব্যাং

কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড: মহাবিশ্বের আদিমতম আলো ও বিগ ব্যাং

মহাবিশ্বের জন্ম রহস্য ও তাত্ত্বিক লড়াই

মহাবিশ্বের জন্ম রহস্য নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। “সবকিছুর শুরু কোথায়?” এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যুগে যুগে এসেছে নানা তত্ত্ব। কেউ বলেছে, মহাবিশ্ব চিরন্তন; কেউ আবার বিশ্বাস করেছে, কোনো এক আদিম মুহূর্তে একটি মহাবিস্ফোরণ বা বিগ ব্যাং থেকেই এর সূচনা।

কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এটা ছিল নিছক তত্ত্বের লড়াই, কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ ছাড়াই। অবশেষে ১৯৬৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির হোলম ডেল টাউনশিপে ঘটে যায় এক বিস্ময়কর ঘটনা, যা বদলে দেয় মহাবিশ্বকে বোঝার ধারণা।

হর্ন অ্যান্টেনা ও দুই তরুণ বিজ্ঞানী

হোলম ডেলের নির্জন পাহাড়ি‌ এলাকায় দাঁড়িয়ে ছিল অদ্ভুত আকৃতির এক বিশাল যন্ত্র—হর্ন অ্যান্টেনা। ১৯৫৯ সালে বেল ল্যাবরেটরিজ এই অ্যান্টেনাটি তৈরি করেছিল মূলত টেলি-কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট থেকে রেডিও সিগন্যাল ধরার জন্য। এর পাশাপাশি মহাকাশের রেডিও তরঙ্গ শনাক্ত করার কাজেও এই যন্ত্রটি ব্যবহার করা হতো।

এখানে কাজ করছিলেন বেল ল্যাবসের দু’জন তরুণ রেডিও অ্যাস্ট্রোনমার—আরনো পেনজিয়াস ও রবার্ট উইলসন। তাঁদের মূল কাজ ছিল মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির রেডিও বিকিরণ মাপা।

রহস্যময় গুনগুন শব্দ

১৯৬৪ সালের একদিন তাঁরা লক্ষ্য করলেন, তাঁদের হর্ন অ্যান্টেনা থেকে একটি নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সিতে নিরবচ্ছিন্নভাবে ভেসে আসছে এক অদ্ভুত গুনগুন শব্দ। আশ্চর্যের বিষয়, এই শব্দ সব দিকেই সমানভাবে ছড়িয়ে আছে।

প্রথমে তাঁরা ভেবেছিলেন, যন্ত্রে নিশ্চয়ই কোনো ত্রুটি হয়েছে। তাঁরা বারবার পরীক্ষা করলেন, অ্যান্টেনা পরিষ্কার করলেন, এমনকি ওপরের পাখির বিষ্ঠা পর্যন্ত সরিয়ে ফেললেন। তবুও শব্দটা একই রকম রয়ে গেল। তাঁরা তখনো বুঝতে পারেননি, এটি কোথা থেকে আসছে। কারণ কোনো নির্দিষ্ট নক্ষত্র বা গ্যালাক্সি নয়—পুরো মহাকাশ জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে এই রহস্যময় বিকিরণ।

প্রিন্সটনের তত্ত্ব ও কাকতালীয় সংযোগ

এদিকে একই সময়ে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে আরেক দল গবেষক বিজ্ঞানী—রবার্ট ডিকে, জিম পিবলস ও তাঁদের সহকর্মীরা একটি তত্ত্ব নিয়ে কাজ করছিলেন। তাঁদের ধারণা ছিল, যদি মহাবিশ্ব সত্যিই বিগ ব্যাং থেকে জন্ম নিয়ে থাকে, তবে সেই আদিম বিস্ফোরণের তাপ আজও ছড়িয়ে থাকার কথা। তবে সেটি হবে খুবই ক্ষীণ আকারের মাইক্রোওয়েভ তরঙ্গদৈর্ঘ্যে। তাঁরা বললেন, এই বিকিরণের তাপমাত্রা হবে প্রায় ২.৭ কেলভিন; অর্থাৎ মহাশূন্যের গড় তাপমাত্রার সামান্য ওপরে।

আর আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, পেনজিয়াস ও উইলসনের অজান্তেই তাঁদের রেডিও অ্যান্টেনা ঠিক সেই বিকিরণই ধরে ফেলেছিল। এটা ছিল ২.৭ কেলভিন তাপমাত্রার কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড (CMB) রেডিয়েশন—মহাবিশ্বের জন্মের প্রতিধ্বনি।

মহাবিশ্বের প্রাচীন আলো: সিএমবি (CMB)

এই বিকিরণকে বলা হয়, মহাবিশ্বের “প্রাচীন আলো”। মহাবিশ্বের বয়স তখন ছিল মাত্র ৩.৮ লক্ষ বছর, এর তাপমাত্রা ছিল প্রায় ৩০০০ কেলভিন। সেই সময় ইলেকট্রন ও প্রোটন একত্র হয়ে নিরপেক্ষ হাইড্রোজেন পরমাণু গঠন করে, আর মহাবিশ্ব প্রথমবারের মতো স্বচ্ছ হয়ে ওঠে। আলো মুক্তভাবে চলাচল শুরু করে।

কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড হচ্ছে সেই আদিম বিকিরণের অবশিষ্টাংশ, যেটা আজও আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে। মহাবিশ্বের প্রসারণের কারণে এই বিকিরণ এখন পরিনত হয়েছে মাইক্রোওয়েভে। এর তরঙ্গদৈর্ঘ্য প্রায় ১ মিলিমিটার। এটা খালি চোখে দেখা যায় না, কিন্তু এই বিকিরণ মহাবিশ্বের সর্বত্র সমানভাবে ছড়িয়ে রয়েছে—আইসোট্রপিক বা দিক নিরপেক্ষভাবে।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, পুরনো যূগের অ্যানালগ টেলিভিশনে চ্যানেল না থাকলে যে ঝিরঝিরে শব্দ শোনা যেত, তারও সামান্য অংশ ছিল এই বিকিরণের প্রতিধ্বনি!

বিগ ব্যাং তত্ত্বের প্রমাণ

১৯৬৫ সালে যখন প্রিন্সটন দলের তত্ত্ব আর বেল ল্যাবসের দুই বিজ্ঞানীর পর্যবেক্ষণ মিলিয়ে দেখা হলো, তখন বিজ্ঞানজগৎ একবাক্যে স্বীকার করে নিল—বিগ ব্যাং তত্ত্ব বিশ্বাসযোগ্য। কারণ এই বিকিরণ অন্য কোনো মডেল ব্যাখ্যা করতে পারে না। এটি ছিল মহাবিশ্বের জন্মের প্রায়োগিক প্রমাণ।

পেনজিয়াস ও উইলসন বুঝতে পারলেন, তাঁদের যন্ত্রের অদ্ভুত সেই শব্দ আসলে মহাবিশ্বের শৈশবের অবশিষ্ট সুর। এটা একটি ফসিল রেডিয়েশন। এই আদিম বিকিরণ বহন করছে মহাবিশ্বের অতীতের স্মৃতি।

নোবেল স্বীকৃতি ও আধুনিক গবেষণা

এই আবিষ্কারের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের বয়স নির্ধারণ করতে সক্ষম হয়েছেন—প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর। বর্তমানে মহাকাশে স্থাপিত WMAP ও প্ল্যাঙ্ক স্যাটেলাইটের সাহায্যে এই আদিম বিকিরণের সূক্ষ্ম পার্থক্য বিশ্লেষণ করে জানা যাচ্ছে মহাবিশ্বের গঠন, পদার্থের বণ্টন, এমনকি রহস্যময় ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি সম্পর্কেও।

এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য ১৯৭৮ সালে পেনজিয়াস ও উইলসন পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তাঁদের কাজ প্রমাণ করে, বিজ্ঞানে কখনো কখনো কৌতূহল আর অপ্রত্যাশিত ঘটনা থেকেই মহাবিশ্বের গভীরতম সত্য উদঘাটিত হয়।

হোলম ডেলের সেই হর্ন অ্যান্টেনা এখন আর গবেষণার কাজে ব্যবহৃত হয় না, তবু নীরবে দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে। মনে হয়, যেন এখনো আকাশের দিকে কান পেতে শোনার চেষ্টা করছে মহাবিশ্বের সেই আদিম সুরের প্রতিধ্বনি।

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular