জন্মদিন ও শ্রদ্ধাঞ্জলি
আজ ২৮ ডিসেম্বর, রসায়নে নোবেলজয়ী মার্কিন প্রাণরসায়নবিদ ক্যারি মালিস-এর জন্মদিন। ১৯৪৪ সালের এইদিনে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। পলিমারেজ চেইন রিএ্যকশন (PCR) এর আবিষ্কারক ছিলেন ক্যারি। তাঁর এই আবিষ্কারটি মলিক্যুলার বায়োলজির একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে গেছে। তাঁকে নিয়ে আগের লেখাটি আজ আবার শেয়ার করলাম। জন্মদিনে তাঁর প্রতি জানাই আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।
একটি আবিষ্কারের কাহিনি ও পিসিআর
মলিক্যুলার বায়োলজিস্টদের কাছে পিসিআর (PCR) বা পলিমারেজ চেইন রিএ্যকশন একটি অতি পরিচিত নাম। এটি হলো ডিএনএ (DNA) অণুকে বহুগুণে বর্ধিত করার একটি সহজ পদ্ধতি।
পিসিআর পদ্ধতিটি গত তিন দশকের বেশি সময় ধরে মলিক্যুলার বায়োলজির বিভিন্ন পরীক্ষায় বহুলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বর্তমান যুগে পিসিআর ছাড়া কোন ডিএনএ ল্যাব কল্পনা করা যায় না। ডিএনএ নিয়ে গবেষণা করার কাজটি সহজ করে দিয়েছে এই পিসিআর প্রযুক্তি।
বাউন্ডুলে বিজ্ঞানী ও বিরক্তিকর কাজ
পিসিআর পদ্ধতিটি আবিষ্কার করেছিলেন ক্যারি মালিস (Kary Mullis) নামে একজন প্রাণরসায়নবিদ। প্রথাগত অর্থে তিনি কোন বিশাল বিজ্ঞানী ছিলেন না। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন কিছুটা বাউন্ডুলে প্রকৃতির।
চাকরি করতেন ক্যালিফোর্নিয়ার একটি বায়োটেক কোম্পানির ডিএনএ কেমিস্ট হিসেবে। তাঁর কাজ ছিল বিভিন্ন অণুজীব থেকে ডিএনএ স্যাম্পল সংগ্রহ করার পর সেগুলোকে বর্ধিত করে বিভিন্ন পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করা। কাজটা ছিল খুবই সময়সাপেক্ষ এবং বিরক্তিকর।
হাইওয়েতে ইউরেকা মোমেন্ট
ক্যারি ভাবলেন কিভাবে কাজটা সহজে করা যায়। এ নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে গিয়ে পিসিআর-এর আইডিয়াটি তাঁর মাথায় হঠাৎ করেই এসেছিল। সময়টা ছিল ১৯৮৩ সাল। ক্যারি তখন হলিডে করছেন তাঁর বান্ধবীর সাথে।
একদিন হাইওয়েতে গাড়ি চালাতে চালাতে তাঁর মাথায় আইডিয়াটা এলো। বিজ্ঞানীরা একেই বলেন, “দি ইউরেকা মোমেন্ট”। ক্যারি গাড়ি থামিয়ে তাঁর বান্ধবীকে বললেন, “ডিএনএ নিয়ে আমি একটি বিরাট সমস্যার সমাধান করে ফেলেছি।”
ডিএনএ রেপ্লিকেশন সমস্যা
ব্যাপারটা খুলেই বলি। ডিএনএ হলো জীবজগতের বংশগতির ধারক এবং বাহক। ডিএনএ অণুর একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি নিজের মত হুবহু আরেকটি ডিএনএ অণু তৈরি করতে পারে। এই প্রক্রিয়াটিকে বলে ডিএনএ রেপ্লিকেশন।
প্রকৃতিতে এই প্রক্রিয়াটি কয়েকটি এনজাইমের সাহায্যে ধাপে ধাপে সম্পন্ন হয়। সেজন্য ল্যাবরেটরীতে এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াটি অনুসরণ করা ছিলো ব্যয় সাপেক্ষ এবং কষ্টসাধ্য ব্যাপার।
ট্যাক পলিমারেজ ও তাপমাত্রার সমাধান
ক্যারি ভেবে দেখলেন, হেলিকেইজ (helicase) এনজাইম ছাড়াও শুধুমাত্র তাপমাত্রা বাড়িয়েই ডিএনএ রেপ্লিকেশনের প্রাথমিক ধাপটির সূচনা করা সম্ভব। কিন্তু সমস্যা হলো ওই তাপমাত্রায় রেপ্লিকেশনের মূল এনজাইম, যার নাম হলো ডিএনএ পলিমারেজ, নষ্ট হয়ে যায়।
তিনি সমস্যাটির সমাধান করার জন্য ‘ট্যাক পলিমারেজ’ (Taq polymerase) নামে এক বিশেষ ধরনের এনজাইমের শরণাপন্ন হলেন। এই এনজাইমটি উচ্চ তাপমাত্রায় নষ্ট হয় না, বরং স্বাভাবিক ডিএনএ পলিমারেজের মতই কাজ করে। ট্যাক পলিমারেজ এনজাইমটির উৎস হলো উষ্ণ প্রস্রবণের মাঝে বসবাসকারী এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া। এর নাম হলো Thermus aquaticus, সংক্ষেপে Taq। উচ্চ তাপমাত্রার মধ্যেও এই ব্যাকটেরিয়াগুলো বেঁচে থাকে।
পরীক্ষার উপাদান ও ফলাফল
ক্যারি তাঁর পরীক্ষার জন্য টেস্টটিউবের ভেতর কিছু নির্দিষ্ট উপাদান একত্রে মেশালেন:
- টার্গেট ডিএনএ (Target DNA)
- প্রাইমার (Primer)
- ডিএনএ নিউক্লিওটাইড (DNA Nucleotides)
- ট্যাক ডিএনএ পলিমারেজ (Taq DNA Polymerase)
এরপর তিনি এই মিশ্রণটি বাফার সলিউশনে রাখলেন। তারপর টেস্টটিউবের তাপমাত্রা একবার বাড়িয়ে, তারপর কমিয়ে এবং আবার বাড়িয়ে দেখলেন এভাবে ডিএনএ রেপ্লিকেশন করা সম্ভব।
এই তাপমাত্রা বাড়ানো এবং কমানোর প্রক্রিয়াটি কয়েকবার করার পর তিনি দেখলেন তার টার্গেট ডিএনএ বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে, অথচ সময় লেগেছে খুবই কম। এই পদ্ধতিটির নাম তিনি দিয়েছিলেন, পলিমারেজ চেইন রিএ্যকশন বা পিসিআর।
পেটেন্ট বঞ্চনা ও নোবেল জয়
তিনি পদ্ধতিটি আবিষ্কার করলেও, কোম্পানির সাথে তাঁর চুক্তি অনুযায়ী তিনি এটি তাঁর নিজের নামে পেটেন্ট করতে পারেননি। পেটেন্ট হয়েছিলো তাঁর কোম্পানির নামে। তবে তাঁর কাজে খুশি হয়ে কোম্পানি তাকে দশ হাজার ডলার বোনাস দিয়েছিলো।
এর কিছুদিন পর তাঁর কোম্পানি ওই পেটেন্টটি অন্য একটি কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দিয়েছিলো, মাত্র ৩০০ মিলিয়ন ডলারে! যার একটি কানাকড়িও ক্যারিকে দেওয়া হয়নি। ক্যারি খুবই হতাশ হয়েছিলেন তাঁর কোম্পানির ব্যবহারে।
কিন্তু নোবেল কমিটি তাকে হতাশ করেননি। তাঁর এই আবিষ্কারটির জন্য ১৯৯৩ সালে রসায়নশাস্ত্রে তিনি নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। তার চেয়েও বড় পুরস্কার হলো তাঁর এই যুগান্তকারী আবিষ্কারটি এখন মলিক্যুলার বায়োলজির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে গেছে।
