Thursday, January 15, 2026

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ওয়েব সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।  আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeবিবিধ বিজ্ঞানগ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার: সময় সংশোধনের ইতিহাস

গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার: সময় সংশোধনের ইতিহাস

২০২৬: নতুন বছরের আড়ালে প্রাচীন ইতিহাস

আজ নতুন একটি বছর শুরু হলো। ক্যালেন্ডারের পাতায় আরেকটি নতুন সংখ্যা যুক্ত হলো—২০২৬। কিন্তু এই সংখ্যার পেছনে লুকিয়ে আছে বহু শতকের ইতিহাস, জ্যোতির্বিদ্যা, ধর্ম, রাজনীতি আর মানবসভ্যতার এক দীর্ঘ সমঝোতার গল্প।

যে ক্যালেন্ডার দেখে আমরা দিন গুনি, জন্মদিন পালন করি, নতুন বছরকে স্বাগত জানাই, সেই গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার মোটেই কোনো “স্বয়ংক্রিয়” বিষয় নয়। এটি মানুষের জ্ঞান, সময় সংশোধন আর দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ফসল।

জুলিয়ান ক্যালেন্ডার ও ১১ মিনিটের গরমিল

এক সময় ইউরোপ জুড়ে ব্যবহৃত হতো জুলিয়ান ক্যালেন্ডার। খ্রিস্টপূর্ব ৪৬ সালে রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার প্রচলন করেছিলেন এই ক্যালেন্ডার। প্রাচীন রোমান ক্যালেন্ডারের জটিলতা দূর করার জন্য বারো মাসের সৌরভিত্তিক জুলিয়ান ক্যালেন্ডার চালু করা হয়েছিল। এতে বছরে ধরা হতো ৩৬৫ দিন, আর প্রতি চার বছর অন্তর একটি অতিরিক্ত দিন যোগ করে লিপ ইয়ার করা হতো।

কিন্তু এই ক্যালেন্ডারের একটি মৌলিক সমস্যা ছিল। প্রকৃত সৌর বছরের তুলনায় জুলিয়ান বছর ছিল প্রায় ১১ মিনিট বেশি দীর্ঘ। এই ছোট্ট পার্থক্যই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জমতে জমতে ঋতুকে ক্যালেন্ডার থেকে ধীরে ধীরে সরিয়ে দিচ্ছিল। বসন্ত আসছিল কাগজের হিসেবে, কিন্তু প্রকৃতির হিসেবে নয়। কৃষিকাজ, ধর্মীয় উৎসব, সব কিছুর সঙ্গেই তৈরি হচ্ছিল এক অদ্ভুত অমিল।

পোপ গ্রেগরি ও ১০ দিন হারিয়ে যাওয়ার গল্প

এই গরমিল থামাতেই ষোড়শ শতকে হস্তক্ষেপ করেন রোমান ক্যাথলিক চার্চের প্রধান, পোপ গ্রেগরি অষ্টম। ১৫৮২ সালে তাঁর নির্দেশে চালু হয় নতুন এক ক্যালেন্ডার ব্যবস্থা, যাকে আজ আমরা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার নামে চিনি।

এই নতুন হিসেব কার্যকর করতে গিয়ে ক্যাথলিক দেশগুলোতে অক্টোবর মাসে এক লাফে দশ দিন বাদ দেওয়া হয়। ১৫৮২ সালের ৪ অক্টোবরের পরের দিনকে সরাসরি ১৫ অক্টোবর হিসেবে ঘোষণা করা হয়। অর্থাৎ স্পেন, ইতালি, পর্তুগালসহ ক্যাথলিক ইউরোপের মানুষ একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখেছিল, তাদের জীবন থেকে হঠাৎ করে দশটি দিন উধাও হয়ে গেছে।

ব্রিটিশ সংশয় ও ১৭৫২ সাল

তবে এই পরিবর্তন ইউরোপজুড়ে একসঙ্গে গ্রহণ করা হয়নি। প্রোটেস্ট্যান্ট দেশগুলো শুরুতে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার মানতে অস্বীকার করে। ফলে ব্রিটেন ও তার উপনিবেশগুলোতে এই সংশোধন আসে অনেক পরে—১৭৫২ সালে।

সে বছর ইংল্যান্ডে সেপ্টেম্বর মাসের ২ তারিখের পরের দিনকে ১৪ সেপ্টেম্বর ঘোষণা করা হয়। তাই ব্রিটিশ ইতিহাসে “দশ দিন হারিয়ে যাওয়া”র ঘটনাটি ঘটেছে ১৭৫২ সালে, ১৫৮২ সালে নয়।

লিপ ইয়ারের সূক্ষ্ম গণিত

গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো লিপ ইয়ার ব্যবস্থার সূক্ষ্ম সংশোধন। প্রতি চার বছর পরপর ফেব্রুয়ারিতে একটি অতিরিক্ত দিন যোগ হয়। এটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু এখানেই হিসেব শেষ নয়।

প্রতি ১০০ বছরে একবার এই নিয়ম বাতিল হয়, আবার প্রতি ৪০০ বছরে সেটি ফের চালু হয়। অর্থাৎ শতাব্দীর বছরগুলো যদি ৪০০ দিয়ে সম্পূর্ণ বিভাজ্য হয়, তবেই সেগুলো লিপ ইয়ার হবে। এই নিয়ম অনুযায়ী:

  • ২০০০ সাল ছিল লিপ ইয়ার।
  • ২১০০, ২২০০ এবং ২৩০০ সাল লিপ ইয়ার হবে না।
  • ২৪০০ সালে আবার লিপ ইয়ার ফিরে আসবে।

এই জটিল হিসেবের উদ্দেশ্য একটাই—পৃথিবী সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করতে যে প্রায় ৩৬৫.২৪২২ দিন সময় লাগে, তার সঙ্গে ক্যালেন্ডারকে যতটা সম্ভব নিখুঁতভাবে মিলিয়ে রাখা। পুরোনো নিয়মে যেখানে ধীরে ধীরে ভুল জমা হচ্ছিল, নতুন নিয়মে সেই ভুল প্রায় থেমে যায়।

বিশ্বজুড়ে সময়ের ছন্দ

আজ গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার শুধু ইউরোপের নয়, প্রায় পুরো বিশ্বের সময় গণনার ভিত্তি। রাষ্ট্র পরিচালনা, বিজ্ঞানচর্চা, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ—সব কিছুই এই একটি ক্যালেন্ডারের ছন্দে বাঁধা। যদিও বহু সংস্কৃতি ও ধর্মে এখনও নিজস্ব ক্যালেন্ডার ব্যবহৃত হয়, তবু দৈনন্দিন জীবনের “সরকারি সময়” বলতে আমরা সবাই শেষ পর্যন্ত গ্রেগরিয়ান ব্যবস্থার কাছেই ফিরে যাই।

উপসংহার

২০২৬ সালের প্রথম সকালটা তাই শুধু আরেকটি নতুন বছরের সূচনা নয়। এটি এক দীর্ঘ মানবিক প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতা। সময়কে মাপার, ঋতুকে ধরার, সূর্যের গতির সঙ্গে পৃথিবীর জীবনকে তাল মিলিয়ে রাখার এক প্রাচীন প্রচেষ্টা, যেটা আজও চলছে নীরবে, শান্তভাবে।

হ্যাপি নিউ ইয়ার।

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular