১৯৭৩ সালের ৩০ জুনের সকালটা ছিল অন্যরকম। পশ্চিম আফ্রিকার আকাশে তখন ঘটতে যাচ্ছে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ। আর সেই গ্রহণকে কেন্দ্র করেই বিজ্ঞানীরা প্রস্তুত হচ্ছিলেন ইতিহাসের অন্যতম সাহসিক কনকর্ড সূর্যগ্রহণ অভিযান-এর জন্য।
সাধারণভাবে সূর্যগ্রহণ মানেই কয়েক মিনিটের জন্য অন্ধকার। তার মধ্যেই সূর্যের চারপাশে জ্বলজ্বলে যে আলোকমুকুট বা সোলার করোনা, তার এক ঝলক দেখা যায়। কিন্তু করোনার প্রকৃত স্বরূপ বোঝার জন্য এই কয়েক মিনিট কখনোই যথেষ্ট ছিল না। বহু দশক ধরে বিজ্ঞানীদের আফসোস ছিল, যদি আর একটু সময় পাওয়া যেত, যদি সূর্যের ওই করোনা স্তরটাকে দীর্ঘক্ষণ ধরে দেখা যেত।
আকাশে গবেষণাগার: কনকর্ড ০০১
এই আক্ষেপ থেকেই জন্ম নেয় এক দুঃসাহসিক ধারণা। যদি সূর্যগ্রহণকে মাটিতে দাঁড়িয়ে না দেখে, আকাশেই তার পেছনে ছুটে যাওয়া যায়? যদি সূর্যগ্রহণের ছায়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উড়ে যাওয়া যায় পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুতগতির বিমানে?
সেই প্রশ্নের উত্তর হয়ে ওঠে কনকর্ড। শব্দের চেয়েও দ্বিগুণ গতিতে উড়তে সক্ষম এই সুপারসনিক যাত্রীবাহী বিমানটিকে বেছে নেওয়া হয় একেবারে বৈজ্ঞানিক অভিযানের বাহন হিসেবে। ফরাসি কনকর্ড ০০১ এর ভেতরে বসানো হয় বিশেষ কিছু যন্ত্রপাতি:
- উচ্চ ক্ষমতার টেলিস্কোপ
- স্পেকট্রোগ্রাফ
- বিশেষ ক্যামেরা
বিমানের জানালাই বদলে হয়ে যায় গবেষণাগারের চোখ।
ছায়ার পিছু ধাওয়া: ঐতিহাসিক উড়ান
পশ্চিম আফ্রিকার আকাশে কনকর্ড যখন শব্দের দ্বিগুণ গতিতে ছুটছে, তখন নিচে পৃথিবীর অনেক জায়গায় সূর্যগ্রহণ শুরু হয়ে শেষও হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কনকর্ড যেন গ্রহণকে ছাড়তেই চায় না। সূর্যগ্রহণের ছায়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে উড়ে চলেছে, ছায়াকে ধরে রাখছে নিজের ডানার নিচে।
এই অভিযানের ফল ছিল অবিশ্বাস্য। যেখানে পৃথিবীর মাটি থেকে সর্বোচ্চ কয়েক মিনিটের বেশি পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা যায় না, সেখানে কনকর্ডের ভেতরে বসে বিজ্ঞানীরা টানা প্রায় ৭৪ মিনিট ধরে সূর্যের করোনাকে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পান।
সোলার করোনা গবেষণায় নতুন দিগন্ত
এই দীর্ঘ সময় ধরে তোলা ছবিগুলো ছিল একেবারে ঐতিহাসিক। করোনার সূক্ষ্ম কাঠামো, আলোকরেখার মতো ছড়িয়ে থাকা প্লাজমার ধারা এবং চৌম্বক ক্ষেত্রের জটিল নকশা—এসব কিছু প্রথমবারের মতো খুব স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।
সূর্যের যে অংশ আমরা খালি চোখে দেখি, সেই ফটোস্ফিয়ারের তাপমাত্রা প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার ডিগ্রি। অথচ এর অনেক ওপরে থাকা সূর্যের বাইরের স্তর করোনা কয়েক মিলিয়ন ডিগ্রি পর্যন্ত উত্তপ্ত। এটা সৌর পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় রহস্যগুলোর একটি।
এই অস্বাভাবিক অতিরিক্ত তাপ কোথা থেকে আসে, সেটা বোঝার জন্য করোনার ভেতরের গঠন, প্লাজমার গতিপ্রকৃতি ও চৌম্বক ক্ষেত্রকে দীর্ঘ সময় ধরে দেখা জরুরি ছিল। কনকর্ডে বসে সূর্যগ্রহণ অনুসরণ করার ফলে বিজ্ঞানীরা সেই সুযোগ পান। এই পর্যবেক্ষণই করোনার অতিরিক্ত উত্তাপের রহস্য বোঝার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে। পরবর্তীতে সৌরঝড়, সৌর বায়ু এবং মহাকাশ আবহাওয়ার ধারণা গড়ে ওঠার পেছনেও এই অভিযানের অবদান রয়ে গেছে।
বিজ্ঞানের অদম্য কৌতূহল
আজ কনকর্ড আর আকাশে ওড়ে না। কিন্তু ১৯৭৩ সালের সেই উড়ান আমাদের মনে করিয়ে দেয় বিজ্ঞানের এক পুরনো সত্য। প্রকৃত কৌতূহল থাকলে মানুষ শুধু প্রশ্নই করে না, প্রশ্নের পেছনে ছুটতেও জানে। প্রয়োজনে সে শব্দের চেয়েও দ্রুত উড়ে সূর্যগ্রহণের ছায়াকে ধরতে পারে, শুধু সূর্যের করোনার দিকে একটু বেশি সময় তাকিয়ে থাকার জন্য।
এই ভিডিওতে কনকর্ডের সেই অবিশ্বাস্য যাত্রার গল্প বলা হয়েছে।
