Wednesday, January 14, 2026

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ওয়েব সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।  আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবাংলাদেশের বিজ্ঞান অগ্রযাত্রা: গবেষণা, উদ্ভাবন ও নতুন যুগের সূচনা

বাংলাদেশের বিজ্ঞান অগ্রযাত্রা: গবেষণা, উদ্ভাবন ও নতুন যুগের সূচনা

বাংলাদেশের বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাস দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা, সীমিত সম্পদ আর নানান প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে এসেছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই সবকিছুর মাঝেও দেশের বিজ্ঞানীরা থেমে থাকেননি। তাঁরা বাংলাদেশের বিজ্ঞান গবেষণা ও অগ্রযাত্রায় নীরবে যে জ্ঞানভিত্তিক পথ নির্মাণ করছেন, সেটা এখন একটি নতুন যুগের সূচনা ঘটাচ্ছে।

আজ বাংলাদেশের বিজ্ঞান আর কেবল ল্যাবরেটরির চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে আন্তর্জাতিক গবেষণার অংশ। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, এটি এখন দেশের ভবিষ্যৎ বিকাশের চালিকাশক্তি।

জিনোম সিকোয়েন্সিং ও জীবপ্রযুক্তিতে সাফল্য

এই অগ্রযাত্রার সবচেয়ে আলোচিত সাফল্যগুলোর একটি হলো পাটের জিনোম সিকোয়েন্সিং। ২০১০ সালে প্রথমবারের মতো পাটের সম্পূর্ণ জিনোম মানচিত্র উন্মোচন করেন ড. মাকসুদুল আলম। তিনি একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর এই কাজ বাংলাদেশকে জিনোমিক্সের বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠা করে।

পরবর্তী পর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরাও প্রকল্পটির বিভিন্ন অংশে যুক্ত হয়ে দেশীয় সক্ষমতা তৈরি করেন। সেই অর্জন দেখিয়েছে, আন্তর্জাতিক মানের উচ্চতর জিনতত্ত্ব গবেষণা বাংলাদেশেও সম্ভব। এটি বাংলাদেশের বিজ্ঞান গবেষণার সক্ষমতারই একটি বড় প্রমাণ।

জীবপ্রযুক্তি ও জিনোম গবেষণায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর হাসিনা খান দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞানী। তিনি ইলিশের জিনোম বিশ্লেষণে নেতৃত্ব দিয়ে স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের জিনগত রহস্য উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

অন্যদিকে ড. সেঁজুতি সাহার নেতৃত্বে শিশুদের সংক্রমণ রোগ, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স ও কোভিড-১৯ জিনোম সিকোয়েন্সিং চলছে। এই খাতে বাংলাদেশের গবেষণা আজ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে স্বীকৃত।

কৃষি গবেষণায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন

বাংলাদেশের কৃষি গবেষণা সাম্প্রতিক সময়ে এক নতুন গতি পেয়েছে। বিশেষত উন্নত জাতের ফসল উদ্ভাবনে ধানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আজ বিশ্বে অন্যতম শীর্ষ উদ্ভাবক দেশ। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) উচ্চফলনশীল, লবণসহনশীল, খরাসহনশীল ও বন্যা-সহনশীল বেশ কিছু জাত উদ্ভাবন করেছে।

ব্রি-ধান ৪৭, ৫২, ৫৭, ৬৫, ৬৬, ৭১, ৮৭, ৯২, ১০০, ১১২ কিংবা স্বল্পমেয়াদি জাত ব্রি-ধান ৩৩, ৮১, ৮৪—এসবই কৃষকদের উৎপাদনশীলতা বাড়িয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের চাপে বারবার ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় কৃষিকে টিকিয়ে রাখতে লবণপ্রতিরোধী ধানের জাতগুলো সত্যিকারের রক্ষাকবচ হয়ে উঠেছে।

আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান IRRI-এর সহায়তায় বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা জিনতত্ত্ব ও মার্কার-অ্যাসিস্টেড ব্রিডিং ব্যবহার করে আরও শক্তিশালী জাত তৈরির কাজে যুক্ত হয়েছেন। এই উদ্যোগ দেশে খাদ্যনিরাপত্তার ভবিষ্যৎকে স্থিতিশীল করছে।

পঞ্চব্রীহি: একটি অনন্য উদ্ভাবন

এছাড়াও, বিশিষ্ট জিন বিজ্ঞানী ড. আবেদ চৌধুরী মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় বসে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে বহু বছর ধরে ধানের জাত নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি উদ্ভাবন করেছেন এক বিশেষ জাতের ধান, যার নাম “পঞ্চব্রীহি”। এই ধান একবার রোপণ করলে পাঁচবার ফসল পাওয়া যায়।

একবার জমিতে ধানের চারা রোপণ করে সেখান থেকে এক বছরের মধ্যেই পাঁচবার ফসল তুলে নেবার ধারণাটি একেবারেই অভিনব। “পঞ্চব্রীহি” কোন সাধারণ রেটুন ধান নয়। এটি উচ্চ ফলনশীল ধান এবং এর চাষাবাদ কৃষকদের জন্য বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হতে পারে।

গম ও অন্যান্য ফসলে প্রযুক্তি

ধানের মতোই গম, ভুট্টা, ডাল, তেলবীজ ও শাকসবজিতেও ব্যাপক অগ্রগতি এসেছে। বিশেষত গমের ক্ষেত্রে রোগপ্রতিরোধী ও উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবনে বাংলাদেশ কৃষি বিজ্ঞানীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ভুট্টা উৎপাদন গত এক দশকে কয়েকগুণ বেড়ে গেছে, যেখানে উন্নত হাইব্রিড জাত একটি প্রধান চালিকাশক্তি।

সবজির ক্ষেত্রে টমেটো, বেগুন, মিষ্টিকুমড়া, আলু ও পেঁয়াজে রোগপ্রতিরোধী ও দ্রুত-বর্ধনশীল জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। যা কৃষিকে আরও বাণিজ্যিক করেছে।

গমের ব্লাস্ট রোগ ও আধুনিক প্রযুক্তি

গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তোফাজ্জল ইসলাম গমের ব্লাস্ট রোগ নিয়ে বাংলাদেশের শীর্ষ গবেষক। ২০১৬ সালে দেশে প্রথম গমের ব্লাস্ট দেখা দিলে তিনিই রোগটির উৎস নির্ণয় করেন। পাশাপাশি জীবাণুর জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং সংক্রমণের পথ বের করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

তাঁর গবেষণায় ব্লাস্টের দ্রুত শনাক্তকরণ, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং রোগপ্রতিরোধী গম উন্নয়নের জন্য বৈজ্ঞানিক ভিত্তি তৈরি হয়েছে। তাঁর কাজ বাংলাদেশে গম উৎপাদন রক্ষা করতে অবদান রেখেছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে টিস্যু কালচার, ডাবল হ্যাপলয়েড প্রযুক্তি, জিন-সম্পাদনা (CRISPR) ও মলিকুলার ব্রিডিং নিয়ে গবেষণা নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ভবিষ্যতে এটি বাংলাদেশের বিজ্ঞান গবেষণা ও কৃষিকে শুধু স্বনির্ভরই নয়, বরং প্রযুক্তিনির্ভর এক আধুনিক কৃষিখাতে রূপ দেবে।

চিকিৎসা, পদার্থবিজ্ঞান ও জলবায়ু গবেষণা

জলবায়ুবিজ্ঞানে বাংলাদেশের অবদান সুস্পষ্ট। প্রফেসর সেলিমুল হক বহু বছর ধরে IPCC-র গবেষণায় নেতৃত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। জলবায়ুর ঝুঁকি, অভিযোজন কৌশল এবং বাংলাদেশের উপকূলীয় স্থিতিস্থাপকতা নিয়ে তাঁর কাজ প্রশংসিত। এসব ক্ষেত্রে তাঁর গবেষণা এখন বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলছে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রফেসর ফেরদৌসী কাদরীর ভ্যাকসিন গবেষণা কলেরা, ডায়রিয়া ও হামের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিশ্বের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠেছে। করোনাকালে দ্রুতগতিতে রোগ বিশ্লেষণ এবং জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ে বাংলাদেশের যে সক্ষমতা তৈরি হয়, সেটা তাঁর দলের কাজকেও সমৃদ্ধ করেছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ আল মামুন উচ্চ-শক্তির প্লাজমা অ্যাস্ট্রোফিজিক্স নিয়ে বহু বছর ধরে গবেষণা করছেন। তাঁর কাজ মহাজাগতিক প্লাজমার জটিল প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তাঁর গবেষণা আন্তর্জাতিক জার্নালে ব্যাপকভাবে উদ্ধৃত হয়। এটি বাংলাদেশি তরুণ পদার্থবিদদের জন্য নতুন অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে।

একই ভাবে, বুয়েটের ড. মারুফ আহমেদ সিগন্যাল প্রসেসিং ও ইমেজিং-সম্পর্কিত গবেষণা করছেন এবং এই বিষয়ে বাংলাদেশের দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলছেন।

প্রযুক্তি ও আগামীর সম্ভাবনা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং ও রোবোটিক্সেও বাংলাদেশ দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে এখন ডেটা সায়েন্স, কম্পিউটার ভিশন, নিউরাল নেটওয়ার্ক—এসব ক্ষেত্রে গবেষণার পরিধি আগের তুলনায় অনেক বিস্তৃত। শিল্প ও স্বাস্থ্যসেবাসহ নানা খাতে এআই-ভিত্তিক সমাধান তৈরির কাজ ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।

এই অগ্রযাত্রার সবচেয়ে বড় ভিত্তি হলো তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ। গণিত অলিম্পিয়াড, রোবটিক্স ক্লাব, বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা দল, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বিজয়—এসব দেখে মনে হয়, বাংলাদেশের বিজ্ঞানচর্চার ভবিষ্যৎ আরও উজ্জ্বল হতে চলেছে।

তরুণদের হাতে এখন তথ্যপ্রযুক্তি, অনলাইন লার্নিং, আর সর্বাধুনিক যন্ত্রপাতির সুযোগ এসেছে। যেটা তাদের গবেষণা ও উদ্ভাবনের পথ খুলে দিচ্ছে।

উপসংহার

বাংলাদেশের বিজ্ঞান তাই এখন আর নিছক একাডেমিক প্রচেষ্টা নয়। এটি দেশের উন্নয়ন কৌশল, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা এবং জাতীয় পরিচয়ের একটি অপরিহার্য অংশ। যে দেশ একসময় দারিদ্র্য ও দুর্যোগের চিত্রে আন্তর্জাতিক সংবাদে উঠে আসত, সেই দেশ আজ বদলে গেছে। জলবায়ুবিজ্ঞান, জিনোম গবেষণা, জনস্বাস্থ্য, কৃষি-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনে অবদান রেখে দেশটি বিশ্বমঞ্চে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করছে।

নতুন যুগের এই অগ্রযাত্রা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য স্মরণ করিয়ে দেয়। একটি জাতি যত শক্তিশালী হয় তার বিজ্ঞানচর্চায়, ততটাই শক্তিশালী হয় তার ভবিষ্যৎ নির্মাণে। বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা সেই ভবিষ্যতের ভিত্তি গড়ে তুলছেন প্রতিদিন, নীরবে, অথচ দৃঢ়ভাবে। বাংলাদেশের বিজ্ঞান গবেষণার এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী দশক হবে নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের বিজ্ঞানের দশক।

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular