Wednesday, January 14, 2026

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ওয়েব সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।  আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeনোবেল পুরষ্কারআব্দুস সালাম: নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানীর জীবন ও কর্ম

আব্দুস সালাম: নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানীর জীবন ও কর্ম

প্রারম্ভিক জীবন ও মেধার স্বাক্ষর

১৯২৬ সালে পাঞ্জাবের জং নামে ছোট্ট এক মফস্বল শহরে প্রফেসর আব্দুস সালাম-এর জন্ম। ছেলেবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। মাত্র ১৪ বছর বয়সেই ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা পাশ করেছিলেন। এই পরীক্ষায় তিনি রেকর্ড পরিমাণ নাম্বার পেয়ে প্রথম বিভাগে প্রথম হন। জীবনে কোন পরীক্ষায় তিনি কখনো দ্বিতীয় হননি।

গণিতে তিনি ছিলেন অত্যন্ত পারদর্শী। পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে অনার্স সহ গ্রাজুয়েশন করেছিলেন। অনার্সেও রেকর্ড পরিমাণ নম্বর পেয়েছিলেন। তাঁর বাবার ইচ্ছে ছিল ছেলে আমলা হবে, সিভিল সার্ভিসে যোগ দেবে। বাবার ইচ্ছা অনুযায়ী তিনি সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা দিলেন। পরীক্ষায় যথারীতি প্রথম হলেন। কিন্তু তাকে সিভিল সার্ভিসের চাকরি দেওয়া হলো না। তাঁর চোখের পাওয়ার খুব বেশি হওয়াতে ডাক্তারি পরীক্ষায় তিনি বাদ পড়ে গেলেন। এটি তাঁর জন্যে শাপে বর হল। বিজ্ঞান চর্চার পথ তাঁর জন্য উন্মুক্ত হলো।

কেমব্রিজ যাত্রা ও গবেষণার শুরু

পরের বছরই তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর গণিতে ডিগ্রি করার জন্য স্কলারশিপ পেয়ে গেলেন। কেমব্রিজে গিয়ে তিনি অসাধারণ ভালো ফলাফল করলেন। গণিত হলো পদার্থবিজ্ঞানের ভাষা। গণিতের মাধ্যমেই তিনি পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী হলেন।

কেমব্রিজে উচ্চতর গণিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি করার পর তিনি তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রী শুরু করলেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল কোয়ান্টাম থিওরি অফ ফিল্ডস। ছাত্র অবস্থায় তাঁর গবেষণা বেশ কয়েকজন বিশ্বখ্যাত পদার্থ বিজ্ঞানীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলো। এদের মধ্যে ছিলেন:

  • উলফ গ্যাং পউলি
  • রবার্ট ওপেনহেইমার
  • পল ডিরাক

দেশে প্রত্যাবর্তন ও হতাশা

পিএইচডি শেষ করে ডক্টর সালাম ১৯৫২ সালে দেশে ফিরে গেলেন। পাঞ্জাবের একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে গণিতের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিলেন। কিন্তু এখানে তাঁর গবেষণা করার কোনো সুযোগ ছিল না। শুধু তাই নয়, কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁকে ছোটখাটো নানা ব্যাপারে হেনস্থা করতো।

এখানে থাকার সময় তিনি একবার পদার্থ বিজ্ঞানী পউলির আমন্ত্রণে তাঁর সাথে দেখা করার জন্য সাতদিনের ছুটিতে বোম্বে গিয়েছিলেন। এজন্য কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁকে শোকজ করেছিলো। যাই হোক, দেশে দুই বছর থাকার পর তিনি বুঝতে পারলেন এখানে থাকলে তিনি বিজ্ঞান জগৎ থেকে সম্পূর্ণ নির্বাসিত হয়ে যাবেন। সেজন্য তিনি ফিরে গেলেন ইংল্যান্ডে। ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডনের ইমপেরিয়াল কলেজে তিনি তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক পদে নিয়োগ পেলেন। এবার গবেষণায় পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করলেন প্রফেসর সালাম। তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের অনেক জটিল সমস্যা নিয়ে কাজ শুরু করলেন তিনি।

আইনস্টাইনের স্বপ্ন ও গ্র্যান্ড ইউনিফাইড থিওরি

সে সময় পদার্থবিজ্ঞানীরা সচেষ্ট ছিলেন প্রাকৃতিক চারটি ফোর্স বা বলকে সমন্বিত করার প্রচেষ্টায়। বিজ্ঞানীরা জানতেন মহাবিশ্বে ফোর্স রয়েছে মোট চারটি: ১. স্ট্রং নিউক্লিয়ার ফোর্স ২. উইক নিউক্লিয়ার ফোর্স ৩. ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক ফোর্স ৪. গ্রাভিটেশনাল ফোর্স

আইনস্টাইন মনে করতেন এই চারটি ফোর্স আসলে একটি প্রাকৃতিক বলেরই ভিন্ন ভিন্ন বহিঃপ্রকাশ। আইনস্টাইন চেয়েছিলেন এই চারটি বলকে একত্রিত করে একই সমীকরণে প্রকাশ করতে। কিন্তু তিনি সেটা করে যেতে পারেননি। এজন্য একে বলা হয় আইনস্টাইনের অসমাপ্ত কাজ। অনেকে একে বলেন, গ্র্যান্ড ইউনিফাইড থিওরি বা সংক্ষেপে GUT। এটা হলো পদার্থ বিজ্ঞানের হোলি গ্রেইল।

ইলেক্ট্রো-উইক ফোর্স ও নোবেল জয়

ষাটের দশকে শুরুতেই প্রফেসর সালাম গ্র্যান্ড ইউনিফাইড থিওরি নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। দীর্ঘ এক দশক গবেষণা করার পর তিনি আবিষ্কার করলেন ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক ফোর্স এবং উইক নিউক্লিয়ার ফোর্স মূলত একটি বলেরই দুইটি ভিন্ন ভিন্ন বহিঃপ্রকাশ। তিনি এর নাম দিয়েছিলেন ইলেক্ট্রো-উইক ফোর্স।

এই ফোর্স বহনকারী কণা হলো W এবং Z বোসন, যাদের অস্তিত্বের কথা তিনি তাঁর সমীকরণে তাত্ত্বিকভাবে প্রকাশ করেছিলেন। পরবর্তীতে পরমাণু বিধ্বংসী পরীক্ষায় এদের অস্তিত্ব নির্ভুলভাবে প্রমাণিত হয়েছে। পদার্থবিজ্ঞানের গ্র্যান্ড ইউনিফাইড থিওরিকে একধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছেন তিনি। তাঁর সাথে এ গবেষণায় যুক্ত ছিলেন আরো দুজন বিজ্ঞানী—স্টিভেন ওয়েনবার্গ এবং শেলডন গ্ল্যাশো। এই যুগান্তকারী আবিষ্কারটির জন্য প্রফেসর আব্দুস সালাম এবং তাঁর এ দুজন সহযোগী বিজ্ঞানী যৌথভাবে ১৯৭৯ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন।

তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে অন্যান্য অবদান

তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে প্রফেসর আব্দুস সালামের কাজের পরিধি ছিল ব্যাপক। তাঁর উল্লেখযোগ্য অন্যান্য কাজের মধ্যে রয়েছে:

  • টু কম্পোনেন্ট নিউট্রিনো থিওরি
  • সুপার সিমেট্রি থিওরি
  • প্রেডিকশন অফ প্রটোন ডিকে
  • রি-নরমালাইজেশন অফ ভেক্টর মেসন থিওরি

বস্তুর স্বরূপ উদ্ঘাটনে বর্তমান যুগের বিজ্ঞানীরা যে স্ট্যান্ডার্ড মডেল দিয়েছেন তাতে প্রফেসর সালামের কাজের অপরিসীম অবদান রয়েছে।

বিজ্ঞান বিস্তারে আইসিটিপি (ICTP)

গবেষণার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিজ্ঞানকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য তিনি ছিলেন সদা সচেষ্ট। জাতিসংঘের বিজ্ঞান বিষয়ক কমিটিগুলোতে তিনি ছিলেন সক্রিয়। বিশেষত উন্নয়নশীল দেশে বিজ্ঞানের অগ্রগতির ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন একজন পথিকৃৎ।

এজন্য তিনি ইতালির ত্রিয়েস্তে স্থাপন করেছিলেন একটি আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা কেন্দ্র। এর নাম হলো ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরিটিক্যাল ফিজিক্স (ICTP)। এই কেন্দ্রটি তিনি স্থাপন করেছিলেন মূলত উন্নয়নশীল দেশের তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানীদের মিলন ক্ষেত্র হিসেবে। এই গবেষণা কেন্দ্রে তরুণ পদার্থবিজ্ঞানীদের বৃত্তি দেয়া হতো যাতে তাঁরা সেখানে নিরিবিলি বসে উচ্চতর বিজ্ঞানের চর্চা করতে পারেন। তিনি তাঁর নোবেল পুরস্কারের সম্পূর্ণ অর্থ ব্যয় করেছেন এই প্রতিষ্ঠানটির জন্য। তাঁর হাত ধরে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অনেক প্রতিভাবান বিজ্ঞানীর জন্ম হয়েছে।

মাতৃভূমিতে অবহেলা ও সাম্প্রদায়িকতা

কিন্তু তাঁর জন্মভূমি পাকিস্তানে প্রফেসর আব্দুস সালামকে বিভিন্ন সময়ে নানারকম বিড়ম্বনার সম্মুখীন হতে হয়েছে। তিনি ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন আহমেদিয়া বা কাদিয়ানী সম্প্রদায় ভুক্ত। পাকিস্তানে আইন করে কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণা করা হয়েছিলো। তিনি এর প্রতিবাদ করেছিলেন।

এর ফলে লাহোরে মৌলবাদী ছাত্ররা তাঁর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করে। তাঁকে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকতে বাঁধা দেওয়া হয়। তিনি পাকিস্তানি রাজনীতিবিদদের বিরাগভাজন হন। অথচ তিনি কখনো রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন না। তিনি ছিলেন আপাদমস্তক একজন বিজ্ঞানী। তিনি তাঁর দেশের মানুষের কল্যাণে অনেক কাজ করেছেন। কিন্তু তাঁর মাতৃভূমি তাঁকে মূল্যায়ন করতে পারেনি। তাকে হতে হয়েছিল সাম্প্রদায়িকতার শিকার।

ব্যক্তিগত জীবন, বিশ্বাস ও প্রয়াণ

ব্যক্তিগত জীবনে প্রফেসর সালাম ছিলেন একজন নিরহংকারী এবং অমায়িক ব্যক্তি। তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ মানুষ। সৃষ্টিকর্তার প্রতি তাঁর ছিল অবিচল বিশ্বাস। ধর্মকে তিনি তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতেন।

নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির পর এক বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, “পবিত্র কুরআন আমাদেরকে আল্লাহর সৃষ্ট প্রাকৃতিক নিয়মগুলির প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছে। আমরা অত্যন্ত ভাগ্যবান যে আমাদের প্রজন্মে আমরা তাঁর অপার সৃষ্টির রূপ কিছুটা হলেও উপলব্ধি করতে পারছি, এজন্য সশ্রদ্ধচিত্তে সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানাই”।

১৯৯৬ সালে ৭০ বছর বয়সে এই ক্ষণজন্মা বিজ্ঞানী পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেছেন। কিন্তু বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তিনি রেখে গেছেন তাঁর বিপুল কর্মযজ্ঞ যা আগামী দিনের বিজ্ঞানীদের জন্য পাথেয় হয়ে থাকবে।

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular