Sunday, November 30, 2025

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ব্লগ সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। এই সাইটে এখন, দেড়শোর বেশি বিজ্ঞান বিষয়ক লেখা রয়েছে। আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeবিজ্ঞানীদের কথাপৃথিবীর ভর কত

পৃথিবীর ভর কত

১৭৯৮ সাল। বিজ্ঞানের ইতিহাসে স্মরণীয় একটি বছর। সেই বছর ব্রিটিশ বিজ্ঞানী হেনরি ক্যাভেনডিশ নির্জন এক প্রাসাদের ঘরে বসে এমন একটি আশ্চর্য পরীক্ষা করেছিলেন, যার ফলাফল দিয়ে প্রথমবারের মতো পৃথিবীর ভর নির্ভরযোগ্যভাবে নির্ণয় করা সম্ভব হয়। তিনি অবশ্য সরাসরি পৃথিবীর ভর মাপেননি; বরং পৃথিবীর গড় ঘনত্ব বের করে সেখান থেকে পৃথিবীর মোট ভর হিসেব করেছিলেন। তাঁর হিসেব মতে পৃথিবীর ঘনত্ব ছিল পানির ঘনত্বের প্রায় ৫.৪৮ গুণ, আর সেই মান থেকে গণনা করে পৃথিবীর ভর দাঁড়ায় আনুমানিক ৫.৭ × ১০^২৪ কিলোগ্রাম।‌ এটা বর্তমানে গৃহীত মান ৫.৯৭ × ১০^২৪ কিলোগ্রামের সঙ্গে বিস্ময়করভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এই পরীক্ষার মূলে ছিল নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রকে বাস্তবে তুলে ধরা। নিউটন বলেছিলেন, যে কোনো দুটি বস্তু একে অন্যকে আকর্ষণ করে, এবং সেই বলের মান F = G (m₁m₂ / r²), এখানে G হলো, মহাকর্ষ ধ্রুবক।
নিউটনের সূত্র জানা থাকলেও পৃথিবীর ভর নির্ণয় করতে হলে G এর মান জানা ছিল বাধ্যতামূলক। কিন্তু G এর প্রকৃত মান ছিল বিজ্ঞানের এক রহস্যময় অজানা সংখ্যা। যতক্ষণ পর্যন্ত না G এর মান নির্ভুলভাবে জানা যাচ্ছে, ততক্ষণ পৃথিবীর ভরও থাকছে অজানা।
ক্যাভেনডিশ আসলে মহাকর্ষ ধ্রুবক G এর মান নির্ভুলভাবে মাপতে চেয়েছিলেন। তিনি দেখলেন, দুটি সীসার বলকে খুব কাছে আনলে তাদের মধ্যে অতি ক্ষীণ আকর্ষণ বল কাজ করে। এই ক্ষীণ বল অনুধাবনের জন্য তিনি ব্যবহার করেন টর্শন ব্যালান্স নামের এক যন্ত্র। এই যন্ত্রে
সূক্ষ্ম তারে ঝোলানো ছোট দুটি সীসার বলের সামনে স্থির অবস্থায় রেখে দেওয়া হলো বড় দুটি ভারী সীসার বল। বড় বলগুলোর আকর্ষণে ঝুলন্ত বল দুটো অতি সামান্য ঘুরে গেল; সেই ক্ষুদ্র কোণ পরিমাপ করেই নির্ণীত হয় G এর মান। তারপর সেই মান নিউটনের সমীকরণে বসিয়ে বের করা হলো পৃথিবীর ঘনত্ব, আর সেখান থেকেই পাওয়া গেল পৃথিবীর ভর।
ক্যাভেনডিশের এই পরীক্ষা ছিল অবিশ্বাস্যরকম সূক্ষ্ম। বাতাসের সামান্য দোলা, মেঝের কম্পন, এমনকি বাইরে ঝড়বৃষ্টির আওয়াজ – সবই তাঁর পরীক্ষাটি নষ্ট করে দিতে পারত। তাই রাতের নিস্তব্ধতায়, জানালা-দরজা বন্ধ রেখে, রাতের পর রাত তিনি পরীক্ষা চালিয়ে গেছেন। তাঁর নিঃশ্বাসের ছোঁয়ায় যন্ত্রের কম্পনে যাতে বিন্দুমাত্র তারতম্য না হয়, সেজন্য দূর থেকে তিনি দূরবীন দিয়ে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে গেছেন। শেষ পর্যন্ত যে ফল মিলল, সেটা শুধু তাঁর যুগের বিজ্ঞানীদের নয়, আজকের প্রযুক্তিযুগেও বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করে। বিজ্ঞানের ইতিহাসে তাই বলা হয়, হেনরি ক্যাভেনডিশ ল্যাবরেটরিতে “পৃথিবীর ওজন মেপে ছিলেন।”
এর আগে পৃথিবী যে আকর্ষণ করে সেটা জানা ছিল, কিন্তু সেই আকর্ষণ থেকে পৃথিবীর ভর ঠিক কত দাঁড়ায়, তার উত্তর জানা ছিল না। ক্যাভেনডিশ হাতের কাছে থাকা সীসার বল, অসীম ধৈর্য আর বুদ্ধির সূক্ষ্ম ব্যবহারে সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। বিজ্ঞানের সৌন্দর্য অনেক সময় চোখে দেখা যায় না, কিন্তু হেনরি ক্যাভেনডিশ সেই অদেখাকেই দৃশ্যমান করে গেছেন।
Tanvir Hossain
Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে প্রবল উৎসাহী। ‌স্কুলে পড়ার সময় অনুসন্ধানী বিজ্ঞান ক্লাবের সাথে জড়িত ছিলেন। তরুণ বয়স থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। তার লেখা বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ বিভিন্ন সময় পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে। সাম্প্রতিক কালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলো সাধারণ পাঠকদের জন্য সহজবোধ্য ভাষায় তুলে ধরেছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তার লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে। লেখালেখির পাশাপাশি দেশ ভ্রমণ এবং মহাকাশের ছবি তোলা তার প্রধান শখ। তানভীর হোসেনের জন্ম এবং বেড়ে ওঠা ঢাকা শহরে। পড়াশোনা করেছেন ঢাকার গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল, ঢাকা কলেজ এবং শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। কৃষি বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি করার পর জেনেটিক্স এবং প্ল্যান্ট ব্রিডিংয়ে মাস্টার্স করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পরবর্তীতে একই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট করেন। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে বিজ্ঞানী হিসেবে এক দশক কাজ করার পর অভিবাসী হিসেবে পাড়ি জমান অস্ট্রেলিয়ায়।‌ তারপর দীর্ঘ পঁচিশ বছর অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করার পর অবসর নিয়েছেন। বর্তমানে আই পি পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments