১৭৯৮ সাল। বিজ্ঞানের ইতিহাসে স্মরণীয় একটি বছর। সেই বছর ব্রিটিশ বিজ্ঞানী হেনরি ক্যাভেনডিশ নির্জন এক প্রাসাদের ঘরে বসে এমন একটি আশ্চর্য পরীক্ষা করেছিলেন, যার ফলাফল দিয়ে প্রথমবারের মতো পৃথিবীর ভর নির্ভরযোগ্যভাবে নির্ণয় করা সম্ভব হয়। তিনি অবশ্য সরাসরি পৃথিবীর ভর মাপেননি; বরং পৃথিবীর গড় ঘনত্ব বের করে সেখান থেকে পৃথিবীর মোট ভর হিসেব করেছিলেন। তাঁর হিসেব মতে পৃথিবীর ঘনত্ব ছিল পানির ঘনত্বের প্রায় ৫.৪৮ গুণ, আর সেই মান থেকে গণনা করে পৃথিবীর ভর দাঁড়ায় আনুমানিক ৫.৭ × ১০^২৪ কিলোগ্রাম। এটা বর্তমানে গৃহীত মান ৫.৯৭ × ১০^২৪ কিলোগ্রামের সঙ্গে বিস্ময়করভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এই পরীক্ষার মূলে ছিল নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রকে বাস্তবে তুলে ধরা। নিউটন বলেছিলেন, যে কোনো দুটি বস্তু একে অন্যকে আকর্ষণ করে, এবং সেই বলের মান F = G (m₁m₂ / r²), এখানে G হলো, মহাকর্ষ ধ্রুবক।
নিউটনের সূত্র জানা থাকলেও পৃথিবীর ভর নির্ণয় করতে হলে G এর মান জানা ছিল বাধ্যতামূলক। কিন্তু G এর প্রকৃত মান ছিল বিজ্ঞানের এক রহস্যময় অজানা সংখ্যা। যতক্ষণ পর্যন্ত না G এর মান নির্ভুলভাবে জানা যাচ্ছে, ততক্ষণ পৃথিবীর ভরও থাকছে অজানা।
ক্যাভেনডিশ আসলে মহাকর্ষ ধ্রুবক G এর মান নির্ভুলভাবে মাপতে চেয়েছিলেন। তিনি দেখলেন, দুটি সীসার বলকে খুব কাছে আনলে তাদের মধ্যে অতি ক্ষীণ আকর্ষণ বল কাজ করে। এই ক্ষীণ বল অনুধাবনের জন্য তিনি ব্যবহার করেন টর্শন ব্যালান্স নামের এক যন্ত্র। এই যন্ত্রে
সূক্ষ্ম তারে ঝোলানো ছোট দুটি সীসার বলের সামনে স্থির অবস্থায় রেখে দেওয়া হলো বড় দুটি ভারী সীসার বল। বড় বলগুলোর আকর্ষণে ঝুলন্ত বল দুটো অতি সামান্য ঘুরে গেল; সেই ক্ষুদ্র কোণ পরিমাপ করেই নির্ণীত হয় G এর মান। তারপর সেই মান নিউটনের সমীকরণে বসিয়ে বের করা হলো পৃথিবীর ঘনত্ব, আর সেখান থেকেই পাওয়া গেল পৃথিবীর ভর।
ক্যাভেনডিশের এই পরীক্ষা ছিল অবিশ্বাস্যরকম সূক্ষ্ম। বাতাসের সামান্য দোলা, মেঝের কম্পন, এমনকি বাইরে ঝড়বৃষ্টির আওয়াজ – সবই তাঁর পরীক্ষাটি নষ্ট করে দিতে পারত। তাই রাতের নিস্তব্ধতায়, জানালা-দরজা বন্ধ রেখে, রাতের পর রাত তিনি পরীক্ষা চালিয়ে গেছেন। তাঁর নিঃশ্বাসের ছোঁয়ায় যন্ত্রের কম্পনে যাতে বিন্দুমাত্র তারতম্য না হয়, সেজন্য দূর থেকে তিনি দূরবীন দিয়ে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে গেছেন। শেষ পর্যন্ত যে ফল মিলল, সেটা শুধু তাঁর যুগের বিজ্ঞানীদের নয়, আজকের প্রযুক্তিযুগেও বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করে। বিজ্ঞানের ইতিহাসে তাই বলা হয়, হেনরি ক্যাভেনডিশ ল্যাবরেটরিতে “পৃথিবীর ওজন মেপে ছিলেন।”
এর আগে পৃথিবী যে আকর্ষণ করে সেটা জানা ছিল, কিন্তু সেই আকর্ষণ থেকে পৃথিবীর ভর ঠিক কত দাঁড়ায়, তার উত্তর জানা ছিল না। ক্যাভেনডিশ হাতের কাছে থাকা সীসার বল, অসীম ধৈর্য আর বুদ্ধির সূক্ষ্ম ব্যবহারে সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। বিজ্ঞানের সৌন্দর্য অনেক সময় চোখে দেখা যায় না, কিন্তু হেনরি ক্যাভেনডিশ সেই অদেখাকেই দৃশ্যমান করে গেছেন।

