বিংশ শতাব্দীর শুরুতে পদার্থবিজ্ঞান যেন হঠাৎ দুটি ভিন্ন পথ ধরে এগোতে শুরু করল। একদিকে নিউটনের পুরনো, দৃশ্যমান ও পরিমাপযোগ্য জগত – যেখানে সবকিছু নির্ভুল নিয়মে বাঁধা এবং ভবিষ্যৎ আগেভাগেই অনুমেয়। অন্যদিকে সদ্য উন্মোচিত কোয়ান্টাম জগত – যেখানে কোন বস্তুকণা একই সময়ে একাধিক অবস্থায় থাকে, পরীক্ষার ফলাফল লেখা থাকে সম্ভাবনায়, আর মাপজোকের কাজটাই যেন বাস্তবতাকে “ঘটিয়ে ফেলে”।
নতুন এই কোয়ান্টাম চিন্তাধারাকে কেন্দ্র করেই জন্ম নিল আধুনিক বিজ্ঞানের ইতিহাসের সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত সংঘর্ষ, আলবার্ট আইনস্টাইন ও নীলস বোরের মধ্যকার “গ্রেট ডিবেট”।
আইনস্টাইন বিশ্বাস করতেন, প্রকৃতির ভেতরে নির্ভুলতা ও নিশ্চয়তা কাজ করে। মানুষ হয়তো এখনো সেটা আবিষ্কার করে উঠতে পারেনি, কিন্তু অজ্ঞতাকে নিয়ম ভেবে বসা চলে না। কোয়ান্টাম তত্ত্ব নিয়ে তাঁর বিখ্যাত উক্তি ছিল “God does not play dice with the universe “- ঈশ্বর মহাবিশ্বকে নিয়ে পাশা খেলেন না। বোরের জবাব ছিল ঠিক তার উল্টো। তাঁর মতে, কোয়ান্টাম জগতে সেই “পাশা খেলা”ই প্রকৃত স্বরূপ; প্রকৃতি যেমন, তাকে তেমনভাবেই বুঝতে হবে, আমাদের পছন্দসইভাবে নয়। এখানে অনিশ্চয়তাই নিয়ম, সেটাই বাস্তব।
এই মতবিরোধ চরমে ওঠে ১৯২৭ সালের সেলভয় কনফারেন্সে। এই কনফারেন্স ডাকা হয়েছিল মূলত কোয়ান্টাম তত্ত্বের জন্মপর্বে দাঁড়িয়ে পদার্থবিদ্যার নতুন বাস্তবতাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়, সেটা নিয়ে বিশ্বের সেরা বিজ্ঞানীদের মুখোমুখি আলোচনার জন্য। ক্লাসিক্যাল নিউটনীয় ধারণা ও নবজাত কোয়ান্টাম ভাবনার সংঘাতে ঠিক কোন পথে তত্ত্বগত পদার্থবিদ্যা এগোবে, তা নিয়ে আলোচনার মঞ্চই ছিল এই সম্মেলন।
সকাল থেকে রাত পর্যন্ত গোল টেবিল ঘিরে বসতেন আইনস্টাইন, বোর, হেইজেনবার্গ, শ্রোডিঙ্গার, ডিরাক, প্ল্যাঙ্ক- আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের সব মহারথীরা। আইনস্টাইন প্রতিদিন নতুন নতুন মানসিক পরীক্ষা সাজিয়ে দেখাতে চাইতেন কোয়ান্টাম তত্ত্বে অভ্যন্তরীণ বিরোধ আছে। বোর রাতভর ভেবে পরদিন শান্ত মাথায় প্রতিটি আপত্তির সুসংহত জবাব দিতেন। উপস্থিতদের বর্ণনায়, সেই সভাকক্ষে যুক্তি ও মেধার যেন বিদ্যুৎ চমকাত।
১৯৩৫ সালে এই দ্বন্দ্ব আরও গভীরে পৌঁছায় যখন আইনস্টাইন, পডলস্কি এবং রোজেন তাঁদের গবেষণাপত্রে দেখান, কোয়ান্টাম তত্ত্ব সত্য হলে দুই দূরবর্তী কণা তৎক্ষণাৎ একে অপরের ফল নির্ধারণ করতে পারে। এর নাম কোয়ান্টাম এন্ট্যাঙ্গেলমেন্ট। আইনস্টাইন ঠাট্টা করে একে বলেছিলেন, “spooky action at a distance”- দূর থেকে যেন কোনো ভৌতিক সংযোগ। তিনি মনে করতেন, কোয়ান্টাম তত্ত্ব অসম্পূর্ণ; এখানে নিশ্চয় কিছু “হিডেন ভ্যারিয়েবল” আছে যা এখনো অজানা। তাঁর চোখে এটি বিজ্ঞানের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।
বোরের উত্তর ছিল ভিন্ন। তিনি বললেন, নিউটনীয় নিয়মে অংশগুলোকে আলাদা ধরে বিচার করলে এখানে সত্য ধরা পড়বে না; কোয়ান্টাম সিস্টেম পুরোটা একসাথে কাজ করে, তাকে খণ্ড খণ্ড করে দেখলে ভুল হওয়াটা অনিবার্য।
আইনস্টাইনের জীবদ্দশায় এই বিতর্কের নিষ্পত্তি হয়নি। কিন্তু ষাটের দশকে, জন স্টুয়ার্ট বেল নামে একজন পদার্থবিজ্ঞানী কোয়ান্টাম এন্ট্যাঙ্গেলমেন্ট নিয়ে আইনস্টাইনের অস্বস্তির উত্তর দিয়েছিলেন। তিনি জড়িয়ে থাকা দুটি দূরবর্তী পদার্থকণার মাঝে অসমতার তত্ত্ব নিয়ে “বেল থিওরেম” প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর মতে, এই অসমতা (Bell inequality) যদি ভেঙ্গে যায় তাহলে বুঝতে হবে, হিডেন ভ্যারিয়েবল দিয়ে এন্ট্যাঙ্গেলমেন্টের ব্যাখ্যা দেওয়া যায় না। অর্থাৎ বেল অসমতার লঙ্ঘনই হলো, কোয়ান্টাম এন্ট্যাঙ্গেলমেন্টের প্রমাণ।
সত্তুরের দশকে জন ক্লাউসার, আশির দশকে অ্যালান আসপেক্ট এবং নব্বইয়ের দশকে অ্যান্টন জেলিঙ্গার পৃথক পৃথক পরীক্ষার মাধ্যমে বেল অসমতার লঙ্ঘন প্রমাণ করেছিলেন। তাঁদের যুগান্তকারী পরীক্ষার মধ্য দিয়েই পদার্থবিজ্ঞানে কোয়ান্টাম এন্ট্যাঙ্গেলমেন্টের সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এজন্য ২০২২ সালে পদার্থবিজ্ঞানে তাঁদের তিনজনকেই নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
তারপরও এই কাহিনীকে “বোর জিতলেন, আইনস্টাইন হারলেন”, এভাবে দেখা ভুল হবে। বরং বলা যায়, আইনস্টাইন না থাকলে কোয়ান্টাম তত্ত্ব কখনো এমন কঠোর পরীক্ষার মুখোমুখি হতো না, আর বোর না থাকলে আইনস্টাইনের কঠোর সমালোচনার সামনে কোয়ান্টাম তত্ত্ব টিকে থাকতে পারত না। তাঁদের বুদ্ধিবৃত্তিক দ্বন্দ্বের কারণেই আজকের কোয়ান্টাম প্রযুক্তির ভিত রচিত হয়েছে।

