Wednesday, January 14, 2026

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ওয়েব সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।  আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeনোবেল পুরষ্কারমেরি কুরি: তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কার ও দুই নোবেলের ইতিহাস

মেরি কুরি: তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কার ও দুই নোবেলের ইতিহাস

প্রারম্ভিক জীবন ও সংগ্রাম

মেরি কুরির জন্ম হয়েছিল ১৮৬৭ সালে, পোল্যান্ডে। তাঁর আসল নাম ছিল মারিয়া স্ক্লোডোভস্কা, কিন্তু বিশ্বজুড়ে তিনি পরিচিত ছিলেন মাদাম কুরি নামে। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অদম্য জিজ্ঞাসু ও মেধাবী।

কিন্তু দুর্ভাগ্য, তখন পোল্যান্ডে নারীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত। তাই অসীম কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করে তিনি পাড়ি দেন প্যারিসের সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে পদার্থবিদ্যা ও গণিতে শীর্ষস্থান অর্জন করেন। আর সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর অসামান্য বৈজ্ঞানিক অভিযাত্রা।

তেজস্ক্রিয়তার রহস্য ও নতুন মৌল

১৮৯৬ সালে অঁরি বেকেরেল দেখালেন, ইউরেনিয়াম নিজে নিজেই এক ধরনের অদ্ভুত বিকিরণ ছড়ায়। পরবর্তীতে একে বলা হলো, রেডিওঅ্যাকটিভিটি বা তেজস্ক্রিয়তা। এই বিকিরণ রহস্য মেরি কুরিকে টেনে নিয়ে গেল অনন্ত কৌতূহলে। স্বামী পিয়ের কুরির সঙ্গে তিনি এ নিয়ে ব্যাপক গবেষণা শুরু করলেন।

কয়েক বছরের নিরলস পরিশ্রম শেষে ১৮৯৮ সালে তাঁরা ঘোষণা করলেন দুটি নতুন তেজস্ক্রিয় মৌল আবিষ্কারের কথা:

  • পোলোনিয়াম: মেরি কুরির নিজ মাতৃভূমি পোল্যান্ডের নামে।
  • রেডিয়াম: যার নামের মধ্যেই রয়েছে বিকিরণের ইঙ্গিত।

এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে কুরি দম্পতি প্রমাণ করলেন, তেজস্ক্রিয় বিকিরণ কোনো সাধারণ রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফল নয়, বরং এটি আসছে পরমাণুর গভীর গঠন থেকে। এই আবিষ্কারের ফলে পদার্থবিজ্ঞানে এক নতুন যুগের সূচনা হলো। বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো বুঝতে পারলেন, পরমাণুর ভেতরে এক বিশাল শক্তির ভাণ্ডার লুকিয়ে আছে।

ক্যানসার চিকিৎসায় বিপ্লব

কুরি দম্পতির পরীক্ষাগারের যন্ত্রপাতি ছিল খুবই সাধারণ। টন টন পিচব্লেন্ড আকরিক থেকে কয়েক মিলিগ্রাম রেডিয়াম আলাদা করতে গিয়ে তাঁদের শরীর ভেঙে যেত, তবুও তাঁরা থামেননি। মাদাম কুরির আবিষ্কার শুধু তত্ত্বেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং মানুষের চিকিৎসা ও প্রযুক্তির পথ একেবারে পাল্টে দিয়েছে।

রেডিয়ামের বিকিরণ দিয়ে শুরু হয় ক্যানসার চিকিৎসার এক নতুন অধ্যায়। আজও কোবাল্ট-৬০, আয়োডিন-১৩১ বা টেকনেশিয়াম-৯৯এম-এর মতো রেডিওঅ্যাকটিভ আইসোটোপ ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যবহার হচ্ছে। এসবই সম্ভব হয়েছে কুরির পথপ্রদর্শক কাজের জন্য। আধুনিক ইমেজিং প্রযুক্তি পিইটি স্ক্যান, যেখানে শরীরের ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ রেডিওঅ্যাকটিভ আইসোটোপ দিয়ে দেখা যায়, সেটিও তাঁর আবিষ্কারের ধারাবাহিক ফসল।

আধুনিক বিজ্ঞানে প্রভাব

শুধু চিকিৎসা নয়, রেডিওঅ্যাকটিভ মৌলগুলির ক্ষয় হারের ভিত্তিতে জন্ম নেয় কার্বন-১৪ ডেটিং প্রযুক্তি, যেটা প্রত্নতত্ত্বে আজ এক অপরিহার্য হাতিয়ার। মানবসভ্যতার অতীত উন্মোচনে ব্যবহৃত এই পদ্ধতির মূলে রয়েছে কুরির রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার।

একইসঙ্গে, পরমাণুর অফুরন্ত শক্তি বোঝার সূত্র ধরে বিশ্ব পেল নিউক্লিয়ার ফিশন ও ফিউশনের জ্ঞান, যার একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, অন্যদিকে ভয়াবহ পারমাণবিক অস্ত্র। এ সবকিছুর মূলেই রয়েছে তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে তাঁর প্রাথমিক অনুসন্ধান।

আত্মত্যাগ ও মর্মান্তিক পরিণতি

কিন্তু বিজ্ঞানের এই আলোকবর্তিকা নিজেই নিজের অজান্তে শরীরে জমা করতে থাকলেন বিকিরণের বিষ। রেডিওঅ্যাকটিভিটির ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে তখনও কেউ জানত না। দিনের পর দিন রেডিয়ামের সরাসরি সংস্পর্শে থেকে তিনি ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়েন।

আজও তাঁর গবেষণার খাতা ও ব্যক্তিগত সামগ্রী এতটাই তেজস্ক্রিয় যে সেগুলো সীসার বাক্সে সংরক্ষণ করতে হয়। অবশেষে ১৯৩৪ সালে, বিকিরণের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাবে সৃষ্ট অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়ায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এটা ছিল তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে তাঁর দীর্ঘ গবেষণার মর্মান্তিক পরিণতি।

দুইবার নোবেল জয় ও অনন্য রেকর্ড

কিন্তু তাঁর কৃতিত্ব এখনো অম্লান। ১৯০৩ সালে তিনি প্রথম নারী হিসেবে নোবেল পুরস্কার পান পদার্থবিজ্ঞানে, অঁরি বেকেরেল ও স্বামী পিয়ের কুরির সঙ্গে যৌথভাবে। বেকেরেলকে দেওয়া হয় ইউরেনিয়ামের বিকিরণ আবিষ্কারের জন্য, আর কুরি দম্পতিকে দেওয়া হয় রেডিওঅ্যাকটিভিটি নিয়ে যুগান্তকারী গবেষণার জন্য।

এরপর ১৯১১ সালে আবার তিনি এককভাবে নোবেল পুরস্কার পান রসায়নে, পোলোনিয়াম ও রেডিয়াম আবিষ্কারের জন্য। আজও তিনি ইতিহাসের একমাত্র ব্যক্তি, যিনি বিজ্ঞানের দুটি ভিন্ন শাখায় নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। এটি কেবল তাঁর অনন্য মেধার নিদর্শন নয়, বরং নারীর বিজ্ঞান-সামর্থ্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

উপসংহার ও আইনস্টাইনের শ্রদ্ধা

মাদাম কুরি দেখিয়েছিলেন, একজন সত্যিকারের বিজ্ঞানীর আসল পরিচয় লুকিয়ে থাকে জ্ঞানের জন্য তাঁর ত্যাগ, তিতিক্ষা এবং কঠোর পরিশ্রমের মধ্যে। তাঁর আবিষ্কার আজও কোটি কোটি মানুষের জীবন বাঁচাচ্ছে। তাঁর জীবন ছিল এক বৈজ্ঞানিক মহাকাব্য—যেখানে কঠোর শ্রম, আত্মত্যাগ, আবিষ্কার আর মানবতার প্রতি অবদান সবকিছু একসূত্রে গাঁথা।

তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছিলেন: “বিশ্বের যত বিখ্যাত মানুষ আছেন, তাঁদের মধ্যে একমাত্র মাদাম কুরি খ্যাতির স্পর্শেও কলুষিত হননি।”

মাদাম কুরির নিজের একটি বিখ্যাত উক্তি দিয়ে শেষ করছি:

“I am among those who think that science has great beauty.” (আমি তাদের দলে, যারা মনে করে বিজ্ঞানের রয়েছে এক অনিন্দ্য সৌন্দর্য।)

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

Most Popular