Thursday, January 15, 2026

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ওয়েব সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।  আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeমহাকাশ বিজ্ঞানমিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি: ডার্ক হর্স নেবুলা ও ব্ল্যাকহোল রহস্য

মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি: ডার্ক হর্স নেবুলা ও ব্ল্যাকহোল রহস্য

শীতের আকাশ ও মিল্কিওয়ে

শীতকালে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির উজ্জ্বল কেন্দ্রটি আমাদের চোখের সামনে ধরা দেয়। তবে এই দৃশ্য উপভোগ করতে হলে শহরের কোলাহল আর কৃত্রিম আলোর বেষ্টনী ছেড়ে যেতে হবে অনেক দূরে। জনমানবহীন এমন কোনো প্রান্তরে, যেখানে রাতের আকাশ প্রকৃত অর্থে নিকষ অন্ধকার।

শীতকালের মেঘমুক্ত অমাবস্যার রাতই গ্যালাক্সির কেন্দ্রের ছবি তোলার সবচেয়ে আদর্শ সময়। কিন্তু হাড় কাঁপানো শীতের রাতে ছবি তোলার জন্য খোলা আকাশের নিচে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা কোনো সহজ কাজ নয়। এর জন্য যেমন দরকার ভালো প্রস্তুতি, তেমনি চাই প্রবল আগ্রহ আর ধৈর্য।

অ্যাস্ট্রোফটোগ্রাফির প্রস্তুতি

বেশ কয়েক বছর ধরেই আমি অ্যাস্ট্রোফটোগ্রাফি শেখার চেষ্টা করছি। একজন অভিজ্ঞ ও দক্ষ অ্যাস্ট্রোফটোগ্রাফারের সঙ্গে দু’টো প্র্যাকটিক্যাল ওয়ার্কশপ করার পর এই কাজের অনেক খুঁটিনাটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বুঝতে শিখেছি। সঠিক ক্যামেরা, লেন্স, ট্রাইপড আর ট্র্যাকার নির্বাচন অ্যাস্ট্রোফটোগ্রাফির অন্যতম ভিত্তি। এর পাশাপাশি থাকে নানা টেকনিক্যাল সেটিংস, যেগুলো ঠিকঠাক না হলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না।

গত কয়েক বছরে বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন সেটিংস ব্যবহার করে গ্যালাক্সির কেন্দ্রের শত শত ছবি তুলেছি। তার মধ্যেই লং এক্সপোজারে ট্র্যাকিং মাউন্টে তোলা এই ছবিটি আমার বিশেষ প্রিয়। ছবিটি তোলার সময় ক্যামেরার কালার টেম্পারেচার সামান্য বাড়িয়ে দিয়েছিলাম, যার ফলে গ্যালাক্সির কেন্দ্রের উষ্ণ, উজ্জ্বল আভাটি আরো স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

গ্যালাক্টিক কোর: নক্ষত্রের মেলা

ছবির ঠিক মাঝখানে দেখা যাচ্ছে গ্যালাক্টিক কোর বা মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রভাগ। এখানে অসংখ্য নক্ষত্র, হাইড্রোজেন গ্যাসের বিশাল মেঘ আর মহাজাগতিক ধূলিকণার স্তর একসাথে মিলেমিশে সৃষ্টি করেছে আলো-ছায়ার এক রহস্যময় জগৎ।

এই গ্যালাক্টিক কোরটি পৃথিবী থেকে প্রায় ২৬,৫০০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। অর্থাৎ, আজ যে আলো আমরা এখানে দেখতে পাচ্ছি, সেই আলো পৃথিবীতে এসে পৌঁছাতে সময় লেগেছে প্রায় সাড়ে ছাব্বিশ হাজার বছর।

গ্যালাক্সির কেন্দ্রের নক্ষত্রঘনত্ব সত্যিই অবিশ্বাস্য। খুব ছোট একটি অঞ্চলের মধ্যেই এখানে নক্ষত্রের সংখ্যা প্রায় দশ মিলিয়ন। রাতের আকাশে আমরা যে বিপুল সংখ্যক তারা দেখি, গ্যালাক্সির কেন্দ্রে নক্ষত্রের ঘনত্ব তার তুলনায় প্রায় কোটি গুণ বেশি।

সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল: স্যাজিটেরিয়াস এ স্টার

কিন্তু সবচাইতে ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো, মিল্কিওয়ের একেবারে কেন্দ্রে অবস্থান করছে একটি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল। বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন, স্যাজিটেরিয়াস এ স্টার। এই ব্ল্যাকহোলটি আবিষ্কার করার জন্য, দু’জন বিজ্ঞানীকে ২০২০ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল।

এই সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলের ভর সূর্যের ভরের প্রায় ৪৩ লক্ষ গুণ এবং এর প্রভাববলয় কয়েক কোটি কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত। এই ব্ল্যাকহোলটি তার চারপাশের বস্তুগুলোকে ধীরে ধীরে নিজের মহাকর্ষীয় কবলে টেনে নিচ্ছে। এর ফলে একে ঘিরে উত্তপ্ত প্লাজমার একটি পরিবৃদ্ধি চক্র, বা অ্যাক্রিশন ডিস্ক, তৈরি হয়েছে।

আমরা জানি, ব্ল্যাকহোল থেকে কোনো আলোকরশ্মি বের হতে পারে না। তাই ব্ল্যাকহোল নিজে সম্পূর্ণ অদৃশ্য থাকে। কিন্তু ব্ল্যাকহোলের চারপাশের পরিবৃদ্ধি চক্রে থাকা কণাগুলো, বিশেষ করে ইলেকট্রন, ব্ল্যাকহোলে বিলীন হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে প্রবল মহাকর্ষীয় শক্তির প্রভাবে তীব্র বিকিরণ সৃষ্টি করে। এই বিকিরণ পুরোপুরি আমাদের চোখে ধরা পড়ে না, কারণ গ্যালাক্সির কেন্দ্রটি ঘন হাইড্রোজেন গ্যাস ও ধূলিকণার মেঘে আচ্ছাদিত। এই আবরণ না থাকলে মিল্কিওয়ের কেন্দ্র আকাশে আরো অনেক বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠত।

ডার্ক হর্স নেবুলা ও মঙ্গল গ্রহ

এই ছবিতে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে ডার্ক হর্স নেবুলা, মিল্কিওয়ের বুক চিরে বয়ে যাওয়া বিশাল এক কালো ঘোড়ার মতো ছায়াময় অবয়ব। একটু দূরেই রয়েছে আরও কয়েকটি ডার্ক নেবুলা। এই নীহারিকাগুলোই নতুন নক্ষত্র জন্মের আঁতুড়ঘর।

আর সেইসাথে একই ফ্রেমে ধরা পড়েছে আমাদের সৌরজগতের নিকট প্রতিবেশী, রক্তিম মঙ্গল গ্রহ—মহাকাশের অসীম গভীরতায় এক ক্ষুদ্র কিন্তু পরিচিত আলোর বিন্দু।

সেই রাতে আমার ক্যামেরার লেন্সে বন্দী হয়েছিল কোটি কোটি বছরের মহাজাগতিক ইতিহাস। আলো আর অন্ধকারের নিরব লুকোচুরি। আর সেই অদৃশ্য দানব ব্ল্যাকহোলের নীরব উপস্থিতি, যেটা চোখে ধরা না পড়লেও, পুরো গ্যালাক্সির ছন্দকে নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে নিঃশব্দে।

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

Most Popular