Wednesday, January 14, 2026

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ওয়েব সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।  আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeমহাকাশ বিজ্ঞানমহাজাগতিক ঘটনা ২০২৬: গ্রহণ, উল্কাবৃষ্টি ও সুপারমুনের বছর

মহাজাগতিক ঘটনা ২০২৬: গ্রহণ, উল্কাবৃষ্টি ও সুপারমুনের বছর

আকাশপ্রেমীদের জন্য এক উৎসবের বছর

২০২৬ সালটা আকাশ-প্রেমীদের জন্য সত্যিই এক স্মরণীয় বছর হতে চলেছে। যাঁরা রাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে চাঁদের দিকে তাকাতে ভালোবাসেন, যাঁরা শহরের কৃত্রিম আলো ছাড়িয়ে একটু অন্ধকার পেলেই নক্ষত্র খোঁজেন, কিংবা ক্যামেরা হাতে নিয়ে উল্কাপাত ধরার স্বপ্ন দেখেন—তাঁদের জন্য ২০২৬ যেন প্রকৃতির পক্ষ থেকে সাজানো এক মহাজাগতিক উৎসব।

বছরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আকাশে ঘটতে থাকা ঘটনাগুলো শুধু চোখ জুড়ানোই হবে না, বরং বারবার মনে করিয়ে দেবে আমাদের মহাবিশ্বের বিশালতা, নিয়ম আর ছন্দের কথা।

জানুয়ারি: উল্কাবৃষ্টি ও বৃহস্পতির ঔজ্জ্বল্য

বছরের শুরুতেই মহাকাশ তার ঝুলি খুলে দেবে।

  • ৩-৪ জানুয়ারি: বছরের একেবারে শুরুতেই সুপারমুনের রাতে এবং পরদিন আকাশে ঝরে পড়বে কোয়াড্রান্টিড উল্কাবৃষ্টি। উত্তর গোলার্ধে যাঁরা থাকেন, তাঁরা ভোরের আগে উত্তর-পূর্বে বুটিস নক্ষত্রমণ্ডলের দিকটায় তাকালেই দেখতে পাবেন হঠাৎ হঠাৎ আকাশ চিরে ছুটে যাওয়া আলোর রেখা।
  • ১০ জানুয়ারি: বৃহস্পতি গ্রহ থাকবে অপোজিশনে (Opposition)। অর্থাৎ সূর্য, পৃথিবী আর বৃহস্পতি প্রায় এক সরল রেখায় অবস্থান করবে। ফলে সারা রাত জুড়েই বৃহস্পতিকে দেখা যাবে সবচেয়ে উজ্জ্বল ও বড় আকারে। ছোট টেলিস্কোপে এর প্রধান উপগ্রহগুলোকেও আলাদা করে চেনা যাবে।

ফেব্রুয়ারি: রিং অব ফায়ার ও গ্রহদের মিছিল

ফেব্রুয়ারি মাসে আকাশ যেন আরও নাটকীয় হয়ে উঠবে।

  • ১৭ ফেব্রুয়ারি: দেখা যাবে অ্যানুলার সোলার এক্লিপস বা ‘রিং অব ফায়ার’ সূর্যগ্রহণ। অ্যান্টার্কটিকার ওপর দিয়ে সূর্যের চারপাশে আগুনের মতো এক উজ্জ্বল বলয় তৈরি হবে। দক্ষিণ আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার বড় অংশে আংশিক গ্রহণ দেখা যাবে।
  • ২৮ ফেব্রুয়ারি: ভোরের আকাশে ঘটবে গ্রহদের মিছিল বা প্ল্যানেটারি প্যারেড। বুধ, শুক্র, মঙ্গল, বৃহস্পতি আর শনি—এরা সবাই সূর্যোদয়ের আগে পূর্ব দিগন্তে সারি বেঁধে দাঁড়াবে।

মার্চ ও এপ্রিল: ব্লাড মুন ও ধূমকেতু

  • ৩ মার্চ: রাতের আকাশ লালচে রঙে রাঙিয়ে দেবে পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ, যাকে আমরা ‘ব্লাড মুন’ বলি। এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা আর প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এই গ্রহণ দেখা যাবে। চাঁদ পুরোপুরি ঢেকে গেলে ধারণ করবে এক তামাটে লাল আভা।
  • ২৫ এপ্রিল: এপ্রিল মাসে আকাশে অতিথি হয়ে আসবে একটি ধূমকেতু, যার নাম সি/২০২৫ আর৩ (C/2025 R3)। ২৫ এপ্রিলের দিকে এটি সবচেয়ে উজ্জ্বল হবে বলে আশা করা হচ্ছে। পরিষ্কার আকাশ পেলে খালি চোখেও ধূমকেতুর লেজ ধরা পড়তে পারে।

মে ও জুন: ব্লু মুন ও গ্রহের সংযোগ

  • ৩১ মে: দেখা যাবে একটি ব্লু মুন। এটি আসলে একই ক্যালেন্ডার মাসে দ্বিতীয় পূর্ণিমা। বিরল বলেই এর আলাদা আকর্ষণ।
  • ৯ জুন: সন্ধ্যার আকাশে ঘটবে বৃহস্পতি আর শুক্রের সংযোগ (Conjunction)। সূর্যাস্তের পর পশ্চিম আকাশে এই দুই উজ্জ্বল গ্রহ খুব কাছাকাছি অবস্থান করবে, যেন আকাশে জ্বালানো দুই প্রদীপ।
  • ২১ জুন: উত্তর গোলার্ধে হবে বছরের দীর্ঘতম দিন বা সামার সলস্টিস।

আগস্ট: সূর্যগ্রহণ ও উল্কাবৃষ্টির যুগলবন্দি

২০২৬ সালের আগস্ট মাসটি মহাকাশপ্রেমীদের জন্য হবে সবচেয়ে ব্যস্ত ও উত্তেজনাপূর্ণ সময়।

  • ১২ আগস্ট: দিনে ঘটবে এক বিরল পূর্ণ সূর্যগ্রহণ। গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড আর স্পেনের ওপর দিয়ে সূর্য পুরোপুরি ঢেকে যাবে।
  • ১২ আগস্ট (রাত): সূর্যগ্রহণের দিনেই রাত নামলে আকাশে শুরু হবে পারসিড উল্কাবৃষ্টির (Perseids) চূড়ান্ত মুহূর্ত। একই দিনে সূর্যগ্রহণ আর রাতে উল্কাবৃষ্টি—এমন যুগল ঘটনা সত্যিই বিরল।
  • ২৮ আগস্ট: মাসের শেষ দিকে দেখা যাবে একটি আংশিক চন্দ্রগ্রহণ।

ডিসেম্বর: বছরের জমকালো সমাপ্তি

বছরের শেষটা হবে একেবারে উৎসবমুখর।

  • ১৩-১৪ ডিসেম্বর: জেমিনিড উল্কাবৃষ্টি আকাশ ভরিয়ে দেবে। বিশেষ করে উত্তর গোলার্ধে এই দৃশ্য সবচেয়ে সুন্দর হবে।
  • ২১-২২ ডিসেম্বর: উত্তর গোলার্ধে নামবে বছরের দীর্ঘতম রাত।
  • ২৪ ডিসেম্বর: বড়দিনের ঠিক আগের রাতে আকাশে উঠবে একটি সুপারমুন। চাঁদ থাকবে পৃথিবীর সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থানে, তাই দেখাবে আরও বড় এবং আরও উজ্জ্বল।

সব মিলিয়ে ২০২৬ সাল আমাদের মনে করিয়ে দেবে, মহাকাশ শুধু বিজ্ঞানের বিষয় নয়; এটি আমাদের আবেগ, বিস্ময় আর কল্পনার এক গভীর ঠিকানা। একটু সময় নিয়ে যদি মাঝেমধ্যে চোখ তুলে আকাশের দিকে তাকানো যায়, তাহলে এই বছরটা সত্যিই হয়ে উঠতে পারে স্মরণীয় এক মহাজাগতিক যাত্রা।

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

Most Popular