Thursday, January 15, 2026

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ওয়েব সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।  আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeপদার্থ বিজ্ঞানজেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল: আধুনিক প্রযুক্তির স্থপতি ও তড়িৎচুম্বকীয় তত্ত্ব

জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল: আধুনিক প্রযুক্তির স্থপতি ও তড়িৎচুম্বকীয় তত্ত্ব

আধুনিক বিশ্বের স্থপতি

প্রতিদিন আমরা মোবাইলে কথা বলি, টিভি দেখি, ওয়াই-ফাই ব্যবহার করি। এগুলো এতই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে আমরা ভাবিই না, এই প্রযুক্তির ভিত্তি কোথায়। অথচ বিজ্ঞানের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, এসবের মূলে রয়েছেন একজন অসাধারণ মানুষ—জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল। আধুনিক বৈদ্যুতিক বিশ্ব তাঁর সমীকরণের উপর দাঁড়িয়ে আছে।

স্কটিশ প্রতিভা ও যুগান্তকারী সমীকরণ

ম্যাক্সওয়েল ছিলেন স্কটল্যান্ডের সন্তান। মাত্র ১৪ বছর বয়সেই তিনি তাঁর প্রথম বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ অবদান হলো, তাঁর সেই বিখ্যাত চারটি সমীকরণ, যেগুলো আজ “ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ” নামে আমাদের কাছে সুপরিচিত।

ম্যাক্সওয়েলের আগে বিজ্ঞানীরা বিদ্যুৎ, চৌম্বকত্ব এবং আলোকে আলাদা আলাদা শক্তি বলে মনে করতেন। ম্যাক্সওয়েল দেখালেন, এরা আসলে একই শক্তির ধারাবাহিক রূপান্তর। প্রকৃতির শক্তিগুলো একই সুতোয় বাঁধা।

আলো, বিদ্যুৎ ও চুম্বকের একীভূতকরণ

তাঁর সমীকরণ জানায়—বৈদ্যুতিক চার্জ বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র তৈরি করে, চলন্ত চার্জ বা বিদ্যুৎ প্রবাহ চৌম্বক ক্ষেত্র সৃষ্টি করে, আর বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র ও চৌম্বক ক্ষেত্র একসাথে পরিবর্তিত হলে জন্ম হয় তরঙ্গের।

সেই তরঙ্গই হলো আলো। এ আলো শুধু চোখে দেখা আলো নয়। রেডিও, মাইক্রোওয়েভ, এক্স-রে, সবই এই একই “ইলেকট্রোম্যাগনেটিক তরঙ্গ” পরিবারের সদস্য।

নিউটন থেকে ফিল্ড থিওরি: দৃষ্টির পরিবর্তন

এর আগে জগতকে দেখা হতো বস্তু আর বলের সম্পর্ক হিসেবে—নিউটনের ক্লাসিকাল দৃষ্টিভঙ্গিতে। ম্যাক্সওয়েল সেই দৃষ্টিকে একেবারে বদলে দিলেন। তিনি বললেন, জগত কেবল বস্তুর নয়, এর মাঝে অদৃশ্য ক্ষেত্রও রয়েছে, যার মধ্য দিয়ে শক্তি ছড়িয়ে পড়ে।

আজ আমরা যে রেডিও শুনি, টিভি দেখি, মোবাইল নেটওয়ার্কে যুক্ত হই—সবই এই ক্ষেত্রের মধ্য দিয়ে তরঙ্গের পরিভ্রমণ।

হেনরিখ হার্টজ ও বেতারের জন্ম

পরে হেনরিখ হার্টজ পরীক্ষাগারে প্রমাণ করলেন, ম্যাক্সওয়েলের সেই তরঙ্গ সত্যিই বিদ্যমান। এরপর মারকনি সেই তরঙ্গ ব্যবহার করে রেডিও যোগাযোগের যুগ শুরু করলেন। অর্থাৎ, তত্ত্ব দিয়েছিলেন ম্যাক্সওয়েল, আর আধুনিক প্রযুক্তি তার ওপর ভর করে এগিয়ে গেল।

রঙিন ছবি ও আরজিবি (RGB) বিপ্লব

ম্যাক্সওয়েল রঙ নিয়েও গবেষণা করেছিলেন। চোখ কীভাবে রঙ দেখে, সেটার রহস্য তিনি উদঘাটন করেন। ১৮৬১ সালে তিনি তোলেন পৃথিবীর প্রথম রঙিন ফটোগ্রাফ—লাল (R), সবুজ (G) এবং নীল (B) ভিত্তিক রংয়ের বিভাজন ব্যবহার করে। আজ আমাদের টিভি, মোবাইল, কম্পিউটারসহ সব স্ক্রিন এই RGB নীতিতেই রঙ তৈরি করে।

আইনস্টাইন ও শেষ কথা

আইনস্টাইন একবার বলেছিলেন, “ম্যাক্সওয়েলের কাজ ছাড়া আমার তত্ত্ব দাঁড়াতই না।” সত্যিই তাই, নিউটনের ক্লাসিক্যাল জগত আর আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করেছিলেন ম্যাক্সওয়েল।

বিজ্ঞানের ইতিহাসে যদি কাউকে সত্যিকারের নীরব বিপ্লবী বলা হয়, তাহলে তিনি হলেন, জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল। আমরা প্রতিদিন তাঁর আবিষ্কৃত অদৃশ্য তরঙ্গের মধ্যে বসবাস করি, অথচ তাঁর নামটিই অনেক সময় উচ্চারিত হয় না।

গত ৫ই নভেম্বর ছিল তাঁর ১৪৬তম মৃত্যুবার্ষিকী। মাত্র ৪৮ বছর বয়সে, ১৮৭৯ সালে তিনি পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যান। তাঁর প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা।

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular