অসীমের ধারণা ও গ্যালিলিও
আলোর গতি মাপা বিজ্ঞানের ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময়কর অধ্যায়। হাজার বছর ধরে মানুষ ভেবেছিল, আলো হয়তো মুহূর্তের মধ্যেই সবদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এর কোনো নির্দিষ্ট গতি নেই, এটি অসীম দ্রুত। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটলও সেটাই বিশ্বাস করতেন।
কিন্তু সপ্তদশ শতকে এক কৌতূহলী মানুষ প্রথম সাহস করে বললেন, আলোও হয়তো একটি নির্দিষ্ট গতিতে চলে। তিনি ছিলেন আধুনিক বিজ্ঞানের জনক, গ্যালিলিও গ্যালিলেই। ১৬৩৮ সালে গ্যালিলিও তাঁর এক সহকারীকে নিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে একটি পরীক্ষা চালান। দু’জনের হাতে ছিল লণ্ঠন। একজন লণ্ঠনের ঢাকনা খুললে অন্যজন সেটি দেখেই নিজের লণ্ঠন খুলতেন।
উদ্দেশ্য ছিল, আলো পৌঁছাতে যে সামান্য সময় লাগে সেটা মাপা। কিন্তু আলো এত দ্রুত চলে যে মানুষের প্রতিক্রিয়ার সময় তার তুলনায় অনেক বেশি। ফলে কোনো সুনির্দিষ্ট ফলাফল পাওয়া গেল না। তবুও গ্যালিলিও বলেছিলেন, আলোর গতি অসীম নয়, তবে অত্যন্ত দ্রুত।
ওলে রোমার ও মহাজাগতিক ঘড়ি
এর প্রায় অর্ধ শতাব্দী পরে, ১৬৭৬ সালে, ড্যানিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী ওলে রোমার বৃহস্পতি গ্রহ ও তার উপগ্রহ আইও-র গতিবিধি দূরবীন দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তিনি লক্ষ্য করলেন, পৃথিবী বৃহস্পতির কাছাকাছি থাকলে আইও-র গ্রহণ সময়মতো ঘটে, কিন্তু দূরে গেলে সামান্য দেরিতে হয়।
সেই দেরি থেকেই রোমার বুঝলেন, আলো একটি নির্দিষ্ট গতিতে চলে, তাই দূরত্ব বাড়লে পৌঁছাতে সময়ও বাড়ে। তিনিই প্রথম প্রমাণ করলেন, আলোর গতি পরিমাপযোগ্য এবং অসীম নয়।
ব্র্যাডলি ও ফিজোর যান্ত্রিক সাফল্য
এরপর ১৭২৮ সালে ইংরেজ বিজ্ঞানী জেমস ব্র্যাডলি “অ্যাবেরেশন অফ লাইট” নামে এক বিস্ময়কর প্রাকৃতিক প্রভাব আবিষ্কার করেন। পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরছে বলে নক্ষত্রদের আলো সামান্য কোণে সরে যায়। এই কোণ থেকেই ব্র্যাডলি হিসেব করেন, আলোর গতি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় তিন লক্ষ কিলোমিটার। এটি ছিল আশ্চর্যজনকভাবে কাছাকাছি একটি অনুমান।
১৮৪৯ সালে ফরাসি বিজ্ঞানী আরমান ফিজো পৃথিবীতে বসেই সরাসরি আলোর গতি মাপতে সক্ষম হন। এটি ছিল বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক অবিশ্বাস্য সাফল্য। তিনি খাঁজযুক্ত একটি দ্রুত ঘূর্ণায়মান চাকায় আলো ফেলেন, যাতে ছিল ৭২০টি ফাঁক। আলো সেই ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরের একটি আয়নায় গিয়ে প্রতিফলিত হয়ে আবার ফিরে আসে।
সেই চাকা এমন নিখুঁত গতিতে ঘুরছিল যেন আলো ফিরে আসার মুহূর্তে ফাঁকটি দাঁতের জায়গায় চলে আসে, ফলে প্রতিফলিত আলো আড়ালে পড়ে যায়। এই সূক্ষ্ম সময়ের ব্যবধান থেকে ফিজো হিসাব করেন আলোর গতি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩,১৩,০০০ কিলোমিটার।
এর কয়েক বছর পর লেওন ফুকো একই পদ্ধতিতে খাঁজযুক্ত চাকাটির পরিবর্তে ঘূর্ণায়মান আয়না ব্যবহার করেন এবং আরও নিখুঁত ফল পান—প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২,৯৮,০০০ কিলোমিটার। আজ উচ্চতর প্রযুক্তির মাধ্যমে আমরা জানি, আলোর প্রকৃত গতি প্রতি সেকেন্ডে ২,৯৯,৭৯২ কিলোমিটার। এটি প্রকৃতির এক সর্বজনীন ধ্রুবক।
মাইকেলসন-মরলি ও ঈথারের খোঁজ
কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়। উনিশ শতকের শেষ দিকে বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করতেন, আলো “ঈথার” নামের এক অদৃশ্য মাধ্যমের মধ্যে দিয়ে ছড়ায়। যেমনভাবে শব্দ তরঙ্গ বায়ুর মধ্যে ছড়ায়। এই ধারণা পরীক্ষা করার জন্য ১৮৮৭ সালে মার্কিন বিজ্ঞানী অ্যালবার্ট মাইকেলসন ও এডওয়ার্ড মরলি এক যুগান্তকারী পরীক্ষা চালান। তাঁদের লক্ষ্য ছিল, ঈথার সত্যিই আছে কি না সেটা প্রমাণ করা।
তাঁরা তৈরি করলেন এক অত্যন্ত সূক্ষ্ম যন্ত্র, ইন্টারফেরোমিটার। এই যন্ত্রের সাহায্যে আলোর দুটি রশ্মি দুই দিক দিয়ে পাঠিয়ে ফের প্রতিফলিত করে একসঙ্গে মিলিয়ে দেখা হত, দুই দিকের আলোর গতির মধ্যে কোনো পার্থক্য আছে কি না।
যদি ঈথার সত্যিই থাকত, তাহলে পৃথিবীর গতির কারণে এক দিকের আলো ঈথারের বিপরীতে, আরেক দিকের আলো ঈথারের স্রোতের সাথে চলত। ফলে তাদের গতিতে সামান্য পার্থক্য থাকার কথা ছিল। কিন্তু পরীক্ষার ফলাফল সবাইকে বিস্মিত করল। আলোর গতিতে কোনো পার্থক্যই দেখা গেল না! অর্থাৎ, আলো সব দিকেই একই গতিতে চলে, ঈথার বলে আসলে কিছুই নেই।
আইনস্টাইন ও নতুন পদার্থবিজ্ঞান
মাইকেলসন-মরলির এই “ব্যর্থ” পরীক্ষাই বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক নতুন বিপ্লবের সূচনা করে। এই ফলাফল থেকেই আলবার্ট আইনস্টাইন ১৯০৫ সালে প্রস্তাব করেন তাঁর বিখ্যাত বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব। তিনি বললেন, আলোর গতি কোনো মাধ্যমের উপর নির্ভর করে না, এটি প্রকৃতির এক চূড়ান্ত ধ্রুবক। আলোর এই গতি সব পর্যবেক্ষকের জন্য একই থাকে, এবং কোনো বস্তুই কখনো আলোর চেয়ে দ্রুতগতিতে চলতে পারে না।
উপসংহার
লণ্ঠন হাতে গ্যালিলিওর ব্যর্থ চেষ্টার মধ্য দিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তার পরিণতি ঘটে মাইকেলসন-মরলির পরীক্ষায় এসে। আজ আমরা জানি, আলোর এই ধ্রুব গতি শুধু পদার্থবিজ্ঞানের এক মৌলিক সত্য নয়; এটি আমাদের সমগ্র প্রযুক্তি সভ্যতার ভিত্তি। জিপিএস থেকে শুরু করে মহাবিশ্বের দূরতম নক্ষত্রের দূরত্ব মাপা, সবখানেই আলোর এই অপরিবর্তনীয় গতি আমাদের পরিমাপের মানদণ্ড হয়ে আছে।
আলোর গতি মাপার এই ইতিহাস কেবল একটি বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান নয়, এটি মানুষের সেই অনন্ত কৌতূহলের গল্প, যে কৌতূহল মানুষকে অন্ধকার ভেদ করে সত্যের দিকে এগিয়ে যেতে জানে।
