Thursday, January 15, 2026

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ওয়েব সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।  আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeবিবিধ বিজ্ঞানপৃথিবীর পানির উৎস: আগ্নেয়গিরি নাকি মহাকাশের ধূমকেতু?

পৃথিবীর পানির উৎস: আগ্নেয়গিরি নাকি মহাকাশের ধূমকেতু?

নীল গ্রহের রহস্য

পৃথিবীর তিন ভাগ জল, এক ভাগ স্থল। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, পৃথিবীতে এত পানি এলো কোত্থেকে? এই প্রশ্নটা যতটা সহজ শোনায়, এর উত্তর ততটাই বিস্ময়কর।

আমাদের চারপাশের নদী, হ্রদ, সাগর, মহাসমুদ্র, হিমবাহ, বরফের স্তুপ—এসব মিলিয়ে যে বিশাল জলরাশি আমরা দেখি, সেটা কিন্তু একদিনে হঠাৎ করে জন্মায়নি। এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে আদিম পৃথিবীর উত্তপ্ত ইতিহাস, আকাশ থেকে নেমে আসা ধূমকেতু ও গ্রহাণুর বরফ, আর পৃথিবীর ভেতরকার আগ্নেয় গহ্বরের দীর্ঘশ্বাস।

আগ্নেয়গিরি ও আউটগ্যাসিং

প্রায় সাড়ে চার শ’ কোটি বছর আগে যখন পৃথিবী সৃষ্টি হচ্ছিল, তখন সেটা ছিল এক ভয়ংকর আগুনের কুন্ড। চারদিকে লাভা, আগ্নেয় গ্যাস আর ধুলোর ঝড়। সেই সময় পৃথিবীর ভেতরকার গলিত শিলা থেকে প্রচুর পরিমাণে জলীয় বাষ্প বের হয়ে বায়ুমণ্ডলে জমা হতে থাকে। আগ্নেয়গিরির মতো অগণিত জ্বালামুখ তখন থেমে থেমে গ্যাস ছুড়ে দিচ্ছিল।

এই বাষ্প ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে ঘনীভূত হয়, আর কোটি কোটি বছরের বৃষ্টিতে তৈরি হয় প্রথম আদিম সমুদ্র। বিজ্ঞানীরা এটাকে বলেন, আউটগ্যাসিং। অর্থাৎ, পৃথিবীর নিজস্ব অভ্যন্তর থেকেই জন্ম নিয়েছিল পানির প্রথম সঞ্চয়।

মহাকাশ থেকে আসা বরফ

কিন্তু শুধু এতেই পৃথিবী জলময় হয়ে উঠেনি। মহাশূন্য থেকেও এসেছিল সাহায্য। পৃথিবীর গঠনের প্রাথমিক সময়ে মহাশূন্যের চারদিকে ঘুরে বেড়ানো বরফময় ধূমকেতু ও জলসমৃদ্ধ গ্রহাণু পৃথিবীর বুকে অনবরত ধাক্কা খেতেই থাকে। প্রতিটি ধাক্কায় বরফ গলে পৃথিবীর ক্রমবর্ধমান সমুদ্রকে একটু একটু করে পূর্ণ করে।

বিজ্ঞানীরা এই মহাজাগতিক জলবাহী বস্তুগুলোর রাসায়নিক “স্বাক্ষর” খুঁজে পেয়েছেন। পানির অণুতে হাইড্রোজেনের ভারী আইসোটোপ ‘ডিউটেরিয়াম’-এর অনুপাত মিলিয়ে দেখা যায়, পৃথিবীর পানির একাংশ সত্যিই এসেছে দূরের মহাকাশ থেকে।

তাই এ যুগের বিজ্ঞানীরা মনে করেন, পৃথিবীর পানির উৎস মূলত দুটি:

১. পৃথিবীর নিজের ভেতর থেকে আসা জলীয় বাষ্প।

২. মহাশূন্যের গ্রহাণু আর ধূমকেতুর বরফ। এই দুই মিলনের ফলেই তৈরি হয়েছে আমাদের এই নীল গ্রহের অগাধ জলভাণ্ডার, যেটা পৃথিবীর প্রায় তিন-চতুর্থাংশ জুড়ে বিস্তৃত।

গোল্ডিলকস জোন ও তরল পানি

আরেকটা ব্যাপার খুব গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর কক্ষপথ সূর্য থেকে একদম সঠিক দূরত্বে অবস্থিত। না বেশি গরম, না বেশি ঠান্ডা—একেবারে জাস্ট রাইট। একে বলা হয় গোল্ডিলকস জোন বা হ্যাবিটেবল জোন।

এই জোন বা বসবাসযোগ্য এলাকার কারণে পৃথিবীর পানি তরল অবস্থায় থেকে গেছে।

  • যদি পৃথিবী সূর্য থেকে একটু দূরে থাকত, আমাদের সাগরগুলো বরফে পরিণত হতো।
  • আর একটু কাছে থাকলে সব পানি বাষ্প হয়ে উবে যেত।

সঠিক অবস্থানের কারণে পৃথিবী পানিকে তরল অবস্থায় ধরে রাখতে পেরেছে, যা প্রাণের বিকাশে মুখ্য ভূমিকা রেখেছে।

মহাজাগতিক উত্তরাধিকার

সব মিলিয়ে পৃথিবীর পানি হলো এক ধরনের মহাজাগতিক উত্তরাধিকার। এই পানি কিছুটা এসেছে পৃথিবীর আগ্নেয় নিঃশ্বাস থেকে, কিছুটা এসেছে দূর আকাশের বরফের উপহার হিসেবে।

কোটি কোটি বছরের মিলিত এই জলচক্র আজ আমাদের নীল গ্রহটিকে এত প্রাণবন্ত করে রেখেছে। আমাদের চোখের সামনে ঢেউ খেলানো সমুদ্রে শুধু নোনাজল নয়, আছে পৃথিবীর জন্মলগ্নের কথা, আছে মহাবিশ্বের দূরবর্তী ধুমকেতু আর গ্রহাণুর স্মৃতি, আর আছে জীবনের প্রথম স্পন্দনের ছাপ।

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular