মহাবিশ্বের জন্মলগ্ন ও আদিম বিশৃঙ্খলা
১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে মহাবিশ্বের জন্মলগ্নে সৃষ্টি হয়েছিল এক বিশাল বিশৃঙ্খলা। এর ফলে বিগ ব্যাংয়ের পরের কয়েক সেকেন্ডে জন্ম নেয় কিছু রহস্যময় বস্তু, যাদের নাম, প্রাইমোরডিয়াল ব্ল্যাকহোল (PBH)।
এসব আদিম ব্ল্যাকহোল কোনো নক্ষত্রের মৃত্যুর ফল নয়, কারণ মহাবিশ্বে তখনও কোন নক্ষত্রের সৃষ্টি হয়নি। বরং মহাবিশ্বের একেবারে প্রাথমিক ঘনত্বের অস্থিরতা থেকেই এদের জন্ম হয়েছিল।
স্টিফেন হকিং ও ব্ল্যাকহোলের মৃত্যু
১৯৭০ এর দশকে প্রখ্যাত পদার্থবিদ স্টিফেন হকিং জানালেন এক আশ্চর্য তত্ত্ব—ব্ল্যাকহোল অমর নয়। ব্ল্যাকহোল ধীরে ধীরে শক্তি হারায়, ভর কমে যায় এবং শেষমেশ বিস্ফোরণে সেটা মিলিয়ে যায়।
ব্ল্যাকহোলের ভর হারানোর এই প্রক্রিয়া আজ পরিচিত ‘হকিং রেডিয়েশন’ নামে। তবে এখন পর্যন্ত আমরা কোনো ব্ল্যাকহোলের বিস্ফোরণ প্রত্যক্ষ করি নাই। এটি এতদিন তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের পাতাতেই সীমাবদ্ধ ছিল।
ডার্ক ইলেকট্রিক চার্জ ও নতুন গবেষণা
কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা নতুন তথ্য দিলেন। তাঁদের মতে, প্রাইমোরডিয়াল ব্ল্যাকহোলের ভেতরে থাকতে পারে এক রহস্যময় বৈদ্যুতিক চার্জ, যাকে তাঁরা বলেছেন ‘ডার্ক ইলেকট্রিক চার্জ’।
এই চার্জ কিছু সময় ব্ল্যাকহোলকে স্থিতিশীল রাখে, কিন্তু একসময় ভারসাম্য ভেঙে যায় আর হঠাৎ ঘটে ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ। এই বিস্ফোরণ কেবল হঠাৎ আলোর ঝলকানি নয়, বরং মহাবিশ্বের মৌলিক কণাদের এক অদ্ভুত প্রদর্শনী। এর ফলে বেরিয়ে আসতে পারে:
- ইলেকট্রন ও কোয়ার্কসহ পরিচিত মৌলিক কণা।
- একেবারে অজানা নতুন কিছু কণা।
- এমনকি বহু আলোচিত ডার্ক ম্যাটার সম্পর্কেও পাওয়া যেতে পারে সরাসরি ইঙ্গিত।
যেন মহাবিশ্ব নিজেই খুলে দিচ্ছে তার জন্মরহস্যের নকশা।
বিস্ফোরণের সম্ভাবনা ও পর্যবেক্ষণ
আগে ধারণা করা হতো, এই ধরনের আদিম ব্ল্যাকহোলের বিস্ফোরণ অত্যন্ত দুর্লভ, লক্ষ বছরে মাত্র একবার ঘটে। কিন্তু ম্যাসাচুসেটস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ বলছে, এর সম্ভাবনা মোটেই এতটা কম নয়।
তাঁদের মতে, আগামী দশ বছরের মধ্যেই অন্তত এমন একটি বিস্ফোরণ প্রত্যক্ষ করার সম্ভাবনা প্রায় ৯০ শতাংশ। মহাকাশে স্থাপিত আধুনিক টেলিস্কোপ ও বিকিরণ শনাক্তকারী যন্ত্রপাতি ইতিমধ্যেই প্রস্তুত।
যদি সত্যিই এমন বিস্ফোরণ ঘটে তবে তা হবে বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক যুগ সন্ধিক্ষণ। এতে শুধু হকিং রেডিয়েশনের সত্যতা প্রমাণিত হবে না, বরং মহাবিশ্বের মৌলিক কণাদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা খুলে যাবে আমাদের চোখের সামনে। এর ফলে পদার্থবিদ্যার মৌলিক ধারণায় পরিবর্তন আসতে পারে।
বিজ্ঞানের নতুন বিপ্লব
ইতিহাসে আমরা যেমন দেখেছি, কোপার্নিকাস পৃথিবীকে মহাবিশ্বের কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। আইনস্টাইন আপেক্ষিকতার তত্ত্ব দিয়ে সময় ও স্থানকে একত্রে বেঁধে দিয়েছিলেন। ঠিক তেমনি প্রাইমোরডিয়াল ব্ল্যাকহোল-এর বিস্ফোরণ শনাক্ত করা গেলে সেই একই ধরণের আরেকটি বিজ্ঞান-বিপ্লবের সূচনা হতে পারে।
হয়তোবা খুব শিগগিরই আমরা মহাকাশে সেই অনন্য মুহূর্ত প্রত্যক্ষ করব, যখন মহাবিশ্ব তার রহস্যের অবগুণ্ঠন সরিয়ে নতুন রূপে আমাদের সামনে ধরা দেবে।
