Thursday, January 15, 2026

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ওয়েব সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।  আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

HomeUncategorizedবার্নহার্ড রিম্যান: আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার গাণিতিক স্থপতি

বার্নহার্ড রিম্যান: আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার গাণিতিক স্থপতি

আপেক্ষিকতার নেপথ্য কারিগর

১৯১৫ সালে আলবার্ট আইনস্টাইন তাঁর সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব প্রকাশ করে মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি আমূল পাল্টে দেন। তিনি দেখালেন, মহাবিশ্বের অবকাঠামো চতুর্মাত্রিক স্পেস-টাইমের বহিঃপ্রকাশ, যেটা ভর-শক্তির উপস্থিতিতে বাঁকা হয়ে যায়। আর স্পেস-টাইমের এই বক্রতাকেই আমরা মহাকর্ষ হিসেবে অনুভব করি।

তার মানে, মহাকর্ষ আসলে কোনো বাহ্যিক বল নয়, এটা মহাবিশ্বেরই অন্তর্নিহিত একটি জ্যামিতিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু আইনস্টাইনের এই কালজয়ী আবিষ্কারের গাণিতিক ভিত্তি তৈরি হয়েছিল আরও ষাট বছর আগে, এক জার্মান গণিতবিদের হাতে। তিনি হলেন, জর্জ ফ্রিডরিশ বার্নহার্ড রিম্যান (১৮২৬–১৮৬৬)।

লাজুক প্রতিভা ও মহাগুরুদের সান্নিধ্য

শৈশব থেকেই রিম্যান ছিলেন অদ্ভুত প্রতিভাধর। অঙ্ক ছিল তাঁর কাছে সহজাত ব্যাপার, কিন্তু স্বভাবে তিনি ছিলেন ভীষণ লাজুক প্রকৃতির। তিনি লোকচক্ষুর আড়ালে থাকতে পছন্দ করতেন। জনসমক্ষে কথা বলার ভয় ছিল তাঁর চিরকাল। নীরবতাই ছিল তাঁর চিন্তা-ভাবনার উৎস।

ভাগ্যক্রমে তিনি পড়াশোনার সুযোগ পান দুই মহাগুরুর কাছে। গণিতের সম্রাট কার্ল ফ্রিডরিখ গাউস এবং পদার্থবিদ ভিলহেলম ভেবার‌ ছিলেন তাঁর দুই শিক্ষা গুরু। এই দুই দিকপালের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠে রিম্যানের মৌলিক চিন্তার জগত।

রিম্যানীয় জ্যামিতি: নতুন দিগন্তের উন্মোচন

১৮৫৪ সালে তিনি উন্মোচন করেন এক নতুন দিগন্ত—রিম্যানীয় জ্যামিতি। তিনি দেখালেন, জ্যামিতিকে কেবল সমতল বা গোলকের সীমায় আবদ্ধ রাখা যায় না; বরং এটি অসংখ্য মাত্রায় সম্প্রসারিত করা সম্ভব। এখান থেকেই জন্ম নেয় দু’টি মৌলিক ধারণা:

  • রিম্যানীয় মেট্রিক
  • রিম্যান কার্ভেচার টেনসর

এর ছয় দশক পর আইনস্টাইন যখন সাধারণ আপেক্ষিকতার সমীকরণ দাঁড় করান, তখন রিম্যানের এই গণিতই হয়ে ওঠে তাঁর সমীকরণের মূল হাতিয়ার।

গণিতের নানা শাখায় অবদান

কিন্তু রিম্যানের অবদান কেবল জ্যামিতিতেই সীমাবদ্ধ নয়। গাণিতিক বিশ্লেষণেও তিনি রেখেছেন অমর ছাপ। তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদানগুলো হলো:

  • রিম্যান ইন্টিগ্রাল: তিনি প্রথম কঠোরভাবে ইন্টিগ্রালের সংজ্ঞা প্রদান করেন।
  • বাস্তব বিশ্লেষণ: ফুরিয়ে সিরিজের উপর তাঁর কাজ আধুনিক বাস্তব বিশ্লেষণের ভিত গড়ে দেয়।
  • জটিল বিশ্লেষণ: তিনি প্রবর্তন করেন ‘রিম্যান সারফেস’, যেটা বিমূর্ত সংখ্যার জগৎকে জ্যামিতির দৃশ্যমান ভাষায় রূপ দেয়।

রিম্যান হাইপোথেসিস: দেড়শ বছরের ধাঁধা

১৮৫৯ সালে তাঁর এক ছোট্ট প্রবন্ধ রেখে যায় আরও বড় এক রহস্য। মৌলিক সংখ্যার বন্টন নিয়ে সেই প্রবন্ধে তিনি উপস্থাপন করেন বিখ্যাত রিম্যান হাইপোথেসিস

এটি আজও অমীমাংসিত, অথচ এর সমাধান আধুনিক গণিত, সংখ্যাতত্ত্ব, ক্রিপ্টোগ্রাফি, এমনকি সুপারকম্পিউটারের অ্যালগরিদম পর্যন্ত বিপ্লব ঘটাতে পারে। এটি গণিত বিশ্বের অন্যতম কঠিন সমস্যা হিসেবে বিবেচিত।

বাস্তব জীবনে রিম্যানের জ্যামিতি

দূরপাল্লার বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে রিম্যানের জ্যামিতি সবচেয়ে বেশি কাজে লাগে। পৃথিবী যেহেতু গোলাকার আর উত্তর-দক্ষিণে একটু চাপা, তাই এক দেশ থেকে আরেক দেশে বিমানের সবচেয়ে ছোট দূরত্ব সরলরেখা হয় না। এটি হয় একটি ‘জিওডেসিক’, অর্থাৎ গোলকের উপর টানা সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত বক্ররেখা।

এই ধারণা সরাসরি এসেছে রিম্যানীয় জ্যামিতি থেকে। তাই মানচিত্রে বিমানের পথকে বাঁকা মনে হলেও, আসলে সেটিই পৃথিবীর বক্রতাকে অনুসরণ করা সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ও কার্যকর রুট।

আধুনিক বিজ্ঞান ও রিম্যানের উত্তরাধিকার

রিম্যানের আরো অনেক অবদান আজও প্রতিদিনের বিজ্ঞানে বেঁচে আছে। মহাবিশ্বের জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক মডেল, ব্ল্যাকহোলের গঠন, মহাকর্ষীয় তরঙ্গ—এসব কিছুরই পেছনে কাজ করছে তাঁর জ্যামিতি।

আবার সংখ্যাতত্ত্ব ও রিম্যান অনুমান সরাসরি যুক্ত আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি, ইন্টারনেট নিরাপত্তা আর এনক্রিপশনের সঙ্গে। অর্থাৎ রিম্যানের চিন্তা শুধু মহাজাগতিক তত্ত্ব নয়, আমাদের ডিজিটাল যুগকেও সমৃদ্ধ করেছে।

মাত্র ৩৯ বছরের জীবনে রিম্যান যেটা রেখে গেছেন, সেটা আজকের বিজ্ঞানকে বহুদূর এগিয়ে নিয়ে গেছে। সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করি সেই মহাজ্ঞানী গণিতজ্ঞ মানুষটিকে, যার ১৯৯তম জন্মদিন ছিল মাত্র কদিন আগেই, ১৭ সেপ্টেম্বর। যিনি দেখিয়ে দিয়ে গেছেন, গণিতই হলো মহাবিশ্বকে বোঝার চাবিকাঠি।

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular